আর্টেমিস-২ চাঁদে পৌঁছাতে কত সময় নেবে, এরপর কী হবে?
নাসা সফলভাবে আর্টেমিস-২ মিশন উৎক্ষেপণ করেছে, যা ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর চাঁদের নিকটবর্তী অঞ্চলে প্রথম মনুষ্যবাহী মিশন। ৩২২-ফুট স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এসএলএস) রকেটটি স্থানীয় সময় বুধবার (১ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়। এটি ওরিয়ন ক্রু ক্যাপসুলটিকে ১০ দিনের এক ঐতিহাসিক যাত্রায় পাঠিয়েছে।
কী ঘটেছিল?
একটি টানটান উত্তেজনার কাউন্টডাউনের পর এই উৎক্ষেপণটি সফল হয়। প্রকৌশলীরা বেশ কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধান করে মিশনটিকে ছাড়পত্র দেন। অতীতে হাইড্রোজেন লিকের কারণে মিশন দেরি হওয়ায় জ্বালানি ভরার সময় টিমগুলো রকেটটিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল, তবে উৎক্ষেপণের দিনে কোনো বড় লিক ধরা পড়েনি। প্রকৌশলীরা ব্যাটারি সেন্সর ও ফ্লাইট টার্মিনেশন সিস্টেমের (সুরক্ষা ব্যবস্থা) শেষ মুহূর্তের সমস্যাগুলোও সমাধান করেন।
এই উৎক্ষেপণটি প্রথমে ৬ ফেব্রুয়ারি ও পরে ৬ মার্চের জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু হাইড্রোজেন লিকের কারণে রকেটটিকে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষার জন্য ভেহিকল অ্যাসেম্বলি বিল্ডিং-এ ফিরিয়ে নিতে হয়েছিল। এরও আগে এটি ২০২৪ সালের নভেম্বরে উৎক্ষেপণের কথা ছিল, যা ওরিয়নের হিট শিল্ড নিয়ে তদন্তের কারণে পিছিয়ে যায়।
আর্টেমিস ২ মিশনে অংশগ্রহণকারী নভোচারীরা
রিড ওয়াইজম্যান (৫০), কমান্ডার : নাসার অভিজ্ঞ সদস্য ও আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের সাবেক কমান্ডার। টেস্ট পাইলট থেকে নভোচারী হওয়া এই অভিজ্ঞ ব্যক্তি মিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
ভিক্টর গ্লোভার (৪৯), পাইলট : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বৈমানিক ও চন্দ্রাভিযানে নিযুক্ত প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী। তিনি এর আগে স্পেসএক্স ক্রু-১-এ ভ্রমণ করেছেন।
ক্রিস্টিনা কচ (৪৭), মিশন স্পেশালিস্ট : নারীদের মধ্যে দীর্ঘতম একক মহাকাশযাত্রার (৩২৮ দিন) রেকর্ডধারী। গভীর মহাকাশ অভিযানে তাঁর বিশেষ দক্ষতা রয়েছে।
জেরেমি হ্যানসেন (৫০), মিশন স্পেশালিস্ট : প্রথম কানাডিয়ান হিসেবে চাঁদে ভ্রমণকারী সাবেক ফাইটার পাইলট।
মিশনটি কখন চাঁদে পৌঁছাবে?
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্যাপসুলটি মিশনের ষষ্ঠ দিন (অর্থাৎ ৬ এপ্রিল) চাঁদে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। মনুষ্যবাহী ওরিয়ন ক্যাপসুলটি চাঁদের চারপাশে প্রদক্ষিণ করবে ও পৃথিবীতে ফেরার যাত্রা শুরু করার আগে সবচেয়ে কাছের বিন্দুতে পৌঁছাবে। ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল এটি চাঁদে অবতরণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আগামী ১০ দিনের মিশনের পরিকল্পনা
প্রথম-দ্বিতীয় দিন : নভোচারীরা মহাকাশযানের সিস্টেমগুলোর ব্যাপক পরীক্ষা চালাবেন। এরপর ‘ট্রান্সলুনার ইনজেকশন’ কৌশলের মাধ্যমে ওরিয়ন পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বের হয়ে সরাসরি চাঁদের পথে যাত্রা শুরু করবে।
তৃতীয়-চতুর্থ দিন : নভোচারীরা সিস্টেমগুলো পর্যবেক্ষণ করবেন। মহাকাশযানটি একটি ‘ফ্রি-রিটার্ন’ গতিপথে চাঁদের পেছন দিয়ে চলে যাবে, যা কোনো বাড়তি জ্বালানি ছাড়াই ক্যাপসুলটিকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম।
পঞ্চম দিন : ওরিয়ন চাঁদের মহাকর্ষীয় টানে প্রবেশ করবে। নভোচারীরা তাঁদের স্পেসস্যুট পরীক্ষা করবেন—কত দ্রুত এটি পরা যায়, চাপ প্রয়োগ করা ও আসনে বেল্ট বাঁধার অনুশীলন করবেন।
ষষ্ঠ দিন : এই দিনে মহাকাশযানটি চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০০-৬০০০ মাইল (৬৪৫০-৯৬৫০ কি.মি.) উপর সবচেয়ে কাছ দিয়ে উড়ে যাবে।
সপ্তম-অষ্টম দিন : ওরিয়ন তার ফ্রি-রিটার্ন গতিপথে চলতে থাকবে। ক্রুরা গভীর মহাকাশে চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করবেন।
দশম দিন : ওরিয়ন সার্ভিস মডিউল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রায় ২৫ হাজার মাইল প্রতি ঘণ্টা গতিতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে ও প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণের মাধ্যমে মিশনের সমাপ্তি ঘটবে।
নাসার পরবর্তী পরিকল্পনা
যদিও আর্টেমিস-২ চাঁদে অবতরণ করবে না, এটি প্রমাণ করবে যে মহাকাশযানটি ভবিষ্যতে ক্রু বহনে সক্ষম। নাসার পরবর্তী মিশন আর্টেমিস-৩ বর্তমানে ২০২৭ সালের জন্য পরিকল্পিত, যেখানে ওরিয়ন মহাকাশযানটি স্পেসএক্সের স্টারশিপ বা ব্লু অরিজিনের ব্লু মুন ল্যান্ডারের সঙ্গে ডক করবে। এই মিশনের মূল লক্ষ্য হলো ২০২৮ সালে আর্টেমিস-৪ -এর মাধ্যমে চাঁদের পৃষ্ঠে পুনরায় মানুষের অবতরণ নিশ্চিত করা।
উৎক্ষেপণের পর মিশন কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলেন, ‘আমরা একটি সুন্দর চন্দ্রোদয় দেখছি। আমরা সরাসরি সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছি।’

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক