বিশ্ববাসীর চোখ ইসলামাবাদে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের আলোচনায় যা থাকছে
মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে লাখ লাখ মানুষের জীবন ও বিশ্ব অর্থনীতির ভাগ্য নির্ভর করছে সপ্তাহান্তে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিতব্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ফলাফলের ওপর। খবর সিএনএনের।
যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো আলোচনায় অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধি দল পাকিস্তান সফরে যাচ্ছে। তাদের আগমন উপলক্ষে কঠোর নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে দেশটিতে দুই দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এতে রাজধানী ইসলামাবাদের রাস্তাঘাট জনশূন্য হয়ে পড়েছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চলছে। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনার পথ উন্মুক্ত হয়। তবে যুদ্ধবিরতি চলাকালে ইরানের মিত্র লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের ব্যাপক প্রাণঘাতী বোমাবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না, তা নিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। তবে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় আলোচনায় ইসরায়েলের কোনো প্রতিনিধি থাকছে না বলে জানা গেছে।
আলোচনায় কারা উপস্থিত থাকবেন?
হোয়াইট হাউসের তথ্যমতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা ইসলামাবাদের স্থানীয় সময় শনিবার (১১ এপ্রিল) সকালে শুরু হতে চলেছে। বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।
তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্রতিনিধি দলের নাম ঘোষণা করেনি। কিছু স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দেশটির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শুরু হওয়া এ যুদ্ধে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ ইরানের বহু সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
কোন বিষয়ে আলোচনা হবে?
দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির জন্য প্রস্তাবিত বিষয়বস্তু নিয়ে উভয় পক্ষ একমত হতে পারছে না, তাই আলোচনা সফল হবে কি না তা বলা কঠিন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত ১০-দফা প্রস্তাবকে “আলোচনার জন্য একটি কার্যকর ভিত্তি” হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তবে ইরানের ১০ দফায় এমন কিছু দাবি আছে, যা কখনোই যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিতে পারেনি। এর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ স্বীকার করে নেওয়া, যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং সমস্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের অধিকারকে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়টিও ১০ দফা প্রস্তাবে রয়েছে বলে জানায় ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভিন্ন একটি ১০-দফা পরিকল্পনা সম্পর্কে কথা বলছিলেন, যা ‘আরও যুক্তিসঙ্গত’ ছিল।
এদিকে ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের ১৫-দফা প্রস্তাব রয়েছে। এসব প্রস্তাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করা হয়নি। তবে বলা হচ্ছে, এর মধ্যে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি, ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর, তেহরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো এই আলোচনা কোনো মধ্যপন্থা তৈরি করতে পারবে কি না, নাকি তা ভেস্তে গিয়ে আবারও যুদ্ধ শুরু হবে। ইতোমধ্যে যুদ্ধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে এবং ঐতিহাসিক বৈশ্বিক তেল সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
লেবাননে কী ঘটছে?
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধবিরতিতে লেবাননের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে এখনও মতবিরোধ রয়েছে। এতে পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় আলোচনা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে ইরানের মতোই চুক্তিটির মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানও বলেছে, যুদ্ধবিরতিতে লেবানন-ভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর ওপর হামলা বন্ধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, এই যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়।
গত বুধবার যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই ইসরায়েল লেবাননে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সবচেয়ে বড় আকারের হামলা শুরু করে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, কোনো পূর্ব-সতর্কতা ছাড়াই ব্যস্ত এলাকাগুলোতে চালানো হামলায় অন্তত ৩০৩ জন নিহত এবং এক হাজার জনেরও বেশি আহত হয়েছেন।
লেবাননে ব্যাপক হামলার ঘটনায় তাৎক্ষণিক বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ইরান। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার গালিবাফ বৃহস্পতিবার বলেন, লেবানন এবং হিজবুল্লাহর মতো ইরানের মদতপুষ্ট বাহিনীগুলো ‘যুদ্ধবিরতির অবিচ্ছেদ্য অংশ’। সময় ফুরিয়ে আসছে।
ইউরোপীয় ও উপসাগরীয় দেশগুলোসহ সারা বিশ্ব থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় ওঠে। আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই যুদ্ধবিরতি ভেঙে যেতে পারে বলে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেছেন, যুদ্ধবিরতিতে লেবাননের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে একটি ‘যৌক্তিক ভুল বোঝাবুঝি’ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলিরা তাদের চলমান হামলার বিষয়ে নিজেদেরকে কিছুটা ‘সংযত’ করতে পারে।
হরমুজ প্রণালি
হোয়াইট হাউসের ভাষ্যমতে, এই চুক্তির আরেকটি অংশ হলো গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি পুনরায় খুলে দেওয়া। ইরান এটি কয়েক সপ্তাহ ধরে বন্ধ করে রাখায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজারে ব্যাপক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
যুদ্ধবিরতি শুরুর পর হাতেগোনা কয়েকটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করতে পেরেছে। হাজার হাজার নাবিকসহ শত শত জাহাজ এখনও পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে আছে।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স জানায়, ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালানোর পর ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আবারও বন্ধ করে দিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ হুঁশিয়ার করে বলেন, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনার সুনির্দিষ্ট পরিণতি ভোগ করতে হবে এবং কঠোর প্রতিক্রিয়া জানানো হবে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বৃহস্পতিবার বলেছেন, ইরান যদি প্রণালিটি পুনরায় খোলার প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, তাহলে যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে যাবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে তেলের ট্যাংকারের ওপর টোল আদায়ের বিরুদ্ধে ইরানকে সতর্ক করেছেন।
ইসলামাবাদের আলোচনা থেকে কি কোনো ফল আসবে?
যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে বিভ্রান্তি থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) আলোচনার প্রস্তুতি নিতে বেশ তৎপর ছিলেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স বলেছেন, ইরান যদি (আলোচনা থেকে) সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা বোকামি হবে। তবে সেটা তাদের সিদ্ধান্ত।
মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে বলেছেন, এই সপ্তাহান্তে ইসলামাবাদের আলোচনা থেকে একটি শান্তি চুক্তি হওয়ার ব্যাপারে তিনি “খুবই আশাবাদী”। তিনি সংবাদমাধ্যমটিকে আরও জানান, ব্যক্তিগত আলোচনায় ইরানের নেতারা শান্তির জন্য উন্মুক্ত বলে তার মনে হয়েছে।
ট্রাম্প এনবিসিকে বলেন, তারা অনেক বেশি যুক্তিবাদী। তাদের যেসব বিষয়ে রাজি হতে হবে, সেসব বিষয়েই তারা রাজি হচ্ছে। মনে রাখবেন, তারা পরাজিত। তাদের কোনো সামরিক শক্তি নেই।
ইরান অবশ্য যুদ্ধ নিয়ে স্পষ্টভাবে ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। দেশটির একাধিক রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণ প্রতিহত করে এবং ওয়াশিংটনকে আলোচনার টেবিলে বসিয়ে ইরান বিরাট বিজয় অর্জন করেছে।
আর আলোচনা যদি আদৌ শুরু হয়, তবুও পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় আলোচনায় দুই পক্ষের মধ্যকার ব্যবধান ঘোচানো যাবে কি না, তা বলা কঠিন। যুদ্ধবিরতি আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রমতে, যুদ্ধ শেষ করার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী ও স্থায়ী চুক্তি নিয়ে বেশ কয়েকবার নিবিড় আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যেই শনিবার (১১ এপ্রিল) হচ্ছে প্রথম বৈঠকটি।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক