আবারও হামলা হলে ‘দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক’ প্রত্যুত্তর দেবে ইরান
ইরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় হামলা চালালে উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে তারা ‘দীর্ঘস্থায়ী এবং বেদনাদায়ক’ আঘাত হানবে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের অধিকারের কথা উল্লেখ করেছে দেশটি। এরফলে এই জলপথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য একটি জোট গঠনের মার্কিন পরিকল্পনা আরও জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের দুই মাস পেরিয়ে গেলেও প্রণালিটি এখনো বন্ধ রয়েছে, যা বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এর পাশাপাশি বেড়েছে অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকিও। খবর আলজাজিরার।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত নিরসনে পাকিস্তানের নেতৃত্বাধীন প্রচেষ্টা বর্তমানে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। ৮ এপ্রিল থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও, ইরান এখনো হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে রেখেছে। মূলত ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধের মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) রাতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার বিষয়টিকে সমর্থন করে বলেছেন, ‘যুদ্ধের কারণে এবং আমাদের অধিকার রক্ষায় এটি করা হয়েছে—অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এটি বৈধ এবং গ্রহণযোগ্য।’
ইসমাইল বাঘাই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, তারা এমন একটি জলপথকে ব্যবহার করছে যার উপকূলীয় রাষ্ট্র হলো ইরান। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে আপনি এই জলপথের অপব্যবহার হতে দিতে পারেন না।
ইসমাইল বাঘাই উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন সম্পদের ওপর হামলার বিষয়টিও যুক্তিসঙ্গত হিসেবে দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত, আঞ্চলিক দেশগুলোও অন্যায় আচরণ করেছে; পবিত্র রমজান মাসে তারা একটি ইসলামি দেশে হামলা চালানোর জন্য বিদেশি পক্ষকে সহযোগিতা করেছে এবং এটি এমন একটি বিষয় যা স্থায়ীভাবে (বিচারের) দাবি হয়ে থাকবে।’
এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার সংযুক্ত আরব আমিরাত তার নাগরিকদের ইরান, লেবানন এবং ইরাক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং যারা বর্তমানে ওই দেশগুলোতে রয়েছে তাদের অবিলম্বে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
এরপর আজ শুক্রবার (১ মে) উপসাগরীয় অঞ্চলে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার ইরানি হুমকির জবাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেছেন, ‘ইরান তার সমস্ত প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে যে বিশ্বাসঘাতকতামূলক আগ্রাসন চালিয়েছে, তারপর তাদের কোনো একতরফা ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখা বা নির্ভর করা যায় না।’
বাহরাইনের রাজা হামাদ বিন ঈসা আল খলিফাও মানামার বিরুদ্ধে ইরানের আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়েছেন এবং তেহরানের বিরুদ্ধে দেশটির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে ফেলার এবং অভ্যন্তরীণ সহযোগীদের উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।
এক বিবৃতিতে বাহরাইনের রাজা হামলাকারীদের পক্ষ নেওয়া ব্যক্তি এবং কিছু সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এসব বিশ্বাসঘাতকদের কারাদণ্ড, নাগরিকত্ব হারানো এবং বহিষ্কারের মুখোমুখি হতে হতে পারে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘দেশের প্রতি আনুগত্য সবার আগে।’ তিনি ঐক্য ও জবাবদিহিতার আহ্বান জানান এবং বলেন যে সংসদকে অবশ্যই শত্রুদের সমর্থনকারীদের থেকে মুক্ত করতে হবে।
নতুন করে মার্কিন হামলা?
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর পুনরায় হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
শুক্রবারই হলো কংগ্রেসের পক্ষ থেকে যুদ্ধ অনুমোদনের শেষ সময়সীমা। অনুমোদন নেওয়া অথবা ৩০ দিনের সময় বাড়ানো ছাড়া আর কোনো পথ নেই, যা ট্রাম্প প্রশাসনকে আজই যুক্তিসহ উপস্থাপন করতে হবে। ১৯৭৩ সালের 'ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন' বা যুদ্ধ ক্ষমতা আইন অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আক্রমণাত্মক অভিযান উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে হবে।
প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার রাতে জানিয়েছেন, উক্ত আইনের ধারা অনুসারে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার মাধ্যমেই শত্রুতা বা সংঘাতের অবসান ঘটেছে। এর মাধ্যমে যুদ্ধের সময়সীমাকে ‘রিসেট’ বা পুনরায় ঠিক করে নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইরানকে আলোচনার টেবিলে বসাতে এবং সংঘাত নিরসনে চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে ধারাবাহিক আরও সামরিক হামলার পরিকল্পনা নিয়ে বৃহস্পতিবার কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ব্রিফিং নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্থাল বৃহস্পতিবার সিএনএন-কে বলেছেন, বিভিন্ন ব্রিফিং এবং অন্যান্য সূত্র থেকে তার এমন ‘ধারণা’ হয়েছে যে, একটি আসন্ন সামরিক হামলার বিষয়টি আলোচনার টেবিলে বেশ জোরালোভাবেই উত্থাপিত হয়েছে।
রিচার্ড ব্লুমেন্থাল আরও বলেন, ‘এই সম্ভাবনা বেশ উদ্বেগজনক কারণ এর ফলে আমেরিকার সন্তানরা বিপদের মুখে পড়তে পারে এবং বিপুল প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।’
হামলা মোকাবিলায় ইরানের প্রস্তুতি
এদিকে, ইরান সম্ভাব্য হামলার মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইরানের আধা-সরকারি মেহের সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রাজধানী তেহরানের কিছু এলাকায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্রিয় হওয়ার শব্দ শোনা গেছে। দেশটির তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো ছোট ড্রোন এবং মনুষ্যবিহীন নজরদারি বিমানের বিরুদ্ধে কাজ করছিল।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো নতুন হামলা—তা সীমিত হলেও—আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী এবং বেদনাদায়ক পাল্টা আঘাতের পথ প্রশস্ত করবে। ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনীর কমান্ডার মাজিদ মুসাভি যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘তোমাদের আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলোর কী অবস্থা হয়েছে তা আমরা দেখেছি, তোমাদের যুদ্ধজাহাজগুলোর ক্ষেত্রেও আমরা একই পরিণতি দেখতে পাবো।’
সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ইরানিদের প্রতি লেখা এক বার্তায় বলেছেন, “প্রণালির নতুন ব্যবস্থাপনার অধীনে ‘শত্রুদের জলপথের অপব্যবহার’ নির্মূল করা হবে।” এটি ইঙ্গিত দেয় যে, তেহরান হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক