পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সাফল্যের পেছনে রয়েছে যে অনুপ্রেরণা
এস পি মুখার্জি রোড দক্ষিণ কলকাতার একটি প্রধান সংযোগ সড়ক। কলকাতার অনেক বাসিন্দা এস পি মুখার্জি বা শ্যামাপ্রাসাদ মুখোপাধ্যায়ের নামের সঙ্গে এভাবেই পরিচিত। এই রাস্তাটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে সংযুক্ত করেছে—এর মধ্যে রয়েছে কালীঘাট ও ভবানীপুর, যেখানে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি এবং তাঁর নির্বাচনি কেন্দ্র অবস্থিত।
আজ, যখন পশ্চিমবঙ্গের জনমত দৃশ্যত বিজেপির পক্ষে যাচ্ছে, তখন সম্ভবত সময় এসেছে শহরবাসীকে বিশ শতকের শুরুর দিকের সেই আইনজীবী, শিক্ষাবিদ এবং জওহরলাল নেহরু সরকারের মন্ত্রীর সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার, যিনি ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন—যেটি বর্তমান বিজেপির পূর্বসূরি সংগঠন।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই সেই কারণ, যার জন্য বিজেপি বলে থাকে যে তারা বাংলার জন্য এত কঠোর লড়াই করেছে। দল তাঁকে একজন প্রতিষ্ঠাতা পুরুষ হিসেবে গণ্য করে।
শ্যামাপ্রাসাদ ছিলেন প্রখ্যাত আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ছেলে, যাকে ‘বাংলার বাঘ’ বলা হতো এবং রাজ্যের স্কুলের পাঠ্যবইয়ে যাঁর নামে একটি আলাদা অধ্যায় রয়েছে। গণিতবিদ, আইনজীবী, আইনজ্ঞ, কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন রেনেসাঁ পুরুষ। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে ছিলেন।
তাঁর ছেলে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯২৯ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে আসেন এবং বঙ্গীয় আইনসভায় প্রবেশ করেন। ১৯৩৯ সালে তিনি বাংলার হিন্দু মহাসভায় যোগ দেন এবং এক বছরের মধ্যেই এর সভাপতি হন। বৃটিশ বিরোধী কুইট ইন্ডিয়া বা ভারত ছাড় আন্দোলনের কঠোর সমালোচক হওয়া সত্ত্বেও, মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর তিনি মহাসভার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং এই হত্যার তীব্র নিন্দা জানান।
জওহেরলাল নেহরুর নেতৃত্বাধীন স্বাধীন ভারতের প্রথম মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হলেও, ১৯৫০ সালে তিনি সরকার ত্যাগ করেন। এরপর জাতীয়তাবাদের আদর্শে একটি দল গঠনের লক্ষ্যে তিনি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
১৯৫১ সালে শ্যামাপ্রসাদ ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। পরের বছর দলটি পার্লামেন্টে তিনটি আসনে জয়লাভ করে। বিজেপি সেই মুহূর্তটিকেই দিল্লির ক্ষমতায় যাওয়ার যাত্রার শুরু হিসেবে বিবেচনা করে।
এই নির্বাচনে বিজেপি প্রায়ই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখ করে নিজেদের বাঙালি পরিচয় বা যোগ্যতার ওপর জোর দিয়েছে—যা মূলত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া ‘বহিরাগত’ তকমা মোকাবিলা করার একটি কৌশল।
বিজেপির সাবেক সভাপতি জে পি নাড্ডা বলেছেন, আজ যদি বাংলা ভারতের অংশ হয়ে থাকে, তবে তা শ্যামাপ্রাসাদ মুখোপাধ্যায়ের কারণেই হয়েছে। শুধু তাই নয়, অবিভক্ত পাঞ্জাবের একটি বড় অংশ যে আজ ভারতের সঙ্গে আছে, তাও তাঁর তোলা আওয়াজের কারণেই সম্ভব হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে লোকসভার ৪২টি আসন রয়েছে, যা পূর্ব ভারতে বিজেপির অগ্রযাত্রার শেষ সীমানা। সেই রাজ্যটিতে এবার বিজেপির দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের বাস্তবায়ন হতে চলেছে। এই যাত্রার শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে।
বিধানসভা নির্বাচনে সেই বছর দলটি ৩টি আসন এবং ১০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এর পাঁচ বছর পরের নির্বাচনে, অর্থাৎ ২০২১ সালে, তারা ৭৭টি আসন এবং ৩৮ শতাংশ ভোট পায়—যা ছিল একটি বিশাল উত্থান। এবার তারা ২৯৪ সদস্যের বঙ্গ বিধানসভায় ইতোমধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ১৪৮টি আসনের গণ্ডি পেরিয়ে গেছে।
তবে চূড়ান্ত চিত্রটি এখনো আসা বাকি।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক