তেলের উৎপাদন কোটা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ওপেক প্লাসের
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো যখন চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন ওপেক প্লাসের সাতটি সদস্য দেশ আবারও অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের কোটা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
ওপেক প্লাসের প্রধান দেশ—সৌদি আরব, রাশিয়া, ইরাক, কুয়েত, কাজাখস্তান, আলজেরিয়া এবং ওমানের মন্ত্রীরা আজ রোববার (৫ জুলাই) একটি ভার্চুয়াল বৈঠকে মিলিত হন। সংস্থাটির পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে তারা দৈনিক ১ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল উৎপাদন সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, এই সমন্বয়টি ২০২৬ সালের আগস্ট মাস থেকে কার্যকর করা হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলাকালীন ইরানের পরিকল্পনা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি প্রায় অচল হয়ে পড়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোকে তেলের উৎপাদন কমাতে হয়েছিল। এর ফলে বেশ কয়েক মাস ধরে তাদের তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ ছিল।
ওপেকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) থেকে মে মাসের মধ্যে তেলের কোটা বাড়ানো এই সাতটি দেশের মধ্যে তিন দেশ—সৌদি আরব, ইরাক এবং কুয়েতের সম্মিলিত উৎপাদন দৈনিক প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল হ্রাস পেয়েছিল।
গত ১৭ জুন তেহরান ও ওয়াশিংটন একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি অনুযায়ী, চুক্তি-পরবর্তী আলোচনা চলাকালীন হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক যান চলাচলের সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে উভয় পক্ষই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়।
সুইস ব্যাংক ইউবিএস-এর পণ্য বাজার বিশ্লেষক জিওভানি স্তাউনুভো িএ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আপাতত উৎপাদন এখনো ওপেকের নির্ধারিত লক্ষ্যের নিচেই রয়েছে।’
আবারও সময়সাপেক্ষ উৎপাদন
সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পূর্বাভাসের কারণে তেলের দামও যুদ্ধপূর্ববর্তী অবস্থার কাছাকাছি নেমে এসেছে।
ব্লুমবার্গ এজেন্সির বরাতে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, এই নৌপথ দিয়ে তেল সরবরাহ ইতোমধ্যেই দৈনিক ১ কোটি ব্যারেল ছাড়িয়ে গিয়ে থাকতে পারে।
তবে স্যাক্সো ব্যাংকের বিশ্লেষক ওলে হ্যানসেন জানান, প্রণালি দিয়ে বর্তমানে যে তেল বাইরে যাচ্ছে তা এতদিন মূলত ট্যাংকার বা মজুতগারে জমা ছিল। তিনি বলেন, ‘বন্ধ থাকা উৎপাদন ক্ষেত্রগুলো পুনরায় চালু করতে কিছুটা সময় লাগে।’
ওলে হ্যানসেন আরও বলেন, ‘যদি জাহাজ চলাচল এভাবে স্বাভাবিক হতে থাকে, তবে জুলাই মাসে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি দেখা যাবে এবং আগস্ট মাসে উৎপাদন বৃদ্ধির গতি সম্ভবত আরও ত্বরান্বিত হবে।’
ঝুঁকিতে ওপেকের ঐক্য
এ প্রসঙ্গে রাইস্টাড এনার্জির বিশ্লেষক হোর্হে লিওন বলেন, ‘আগামী বছরের জন্য সবাই বাজারে তেলের উদ্বৃত্তের পূর্বাভাস দিচ্ছে।’
যুদ্ধের সময় যেসব দেশ তাদের মজুত তেল ব্যবহার করেছিল, তাদের সেই ঘাটতি পূরণ করার কারণে শুরুতে এই অতিরিক্ত তেলের প্রবাহ বাজারে খাপ খেয়ে যাবে। তবে পরবর্তীতে উৎপাদনকারীদের তেলের দাম কমে যাওয়ার তীব্র চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।
গত মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় ওপেক প্লাস ইতিমধ্যেই কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সদস্য দেশগুলো যখন উৎপাদন বাড়ানোর জন্য চাপ দেবে, তখন সংগঠনটিকে তেলের পতনমুখী দাম নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হবে।
জুন মাসের শেষের দিকে ইরাকি তেল মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিশেষ করে ইরাক মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় তাদের যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নিতে কার্টেলটির (ওপেক প্লাস) কাছে উৎপাদন কোটা বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে তারা।
তবে হ্যানসেন মনে করেন, উচ্চতর কোটার এই প্রয়োজনীয়তা ‘খুব জরুরি নয়’, কারণ উৎপাদন এখনো যুদ্ধপূর্ববর্তী পর্যায় থেকে অনেক দূরে রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইরাকের এই অনুরোধটি ২০২৭ সালের সক্ষমতা পর্যালোচনার অংশ হতে পারে, যেখানে দেশগুলোর মূল উৎপাদন সক্ষমতা যাচাই করা হবে।
বছরের শেষের দিকে ওপেক প্লাসের সদস্য দেশগুলোর উৎপাদন ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে তাদের কোটা পুনর্মূল্যায়ন করার কথা রয়েছে। তবে এটি পরবর্তীতে একটি জটিল ও স্পর্শকাতর বিষয়ে পরিণত হতে পারে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক