জ্বালানি সংকটে অন্ধকারে কিউবা
ভয়াবহ জ্বালানি সংকটের মধ্যে আবারও দেশজুড়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখে পড়েছে কিউবা। স্থানীয় সময় সোমবার (৬ জুলাই) জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড পুরোপুরি বিকল হয়ে যাওয়ায় দেশজুড়ে অন্ধকার নেমে আসে। দেশটির সরকার বলছে, জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে।
কিউবার জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার কারণে এই ব্ল্যাকআউটের ঘটনা ঘটেছে। গ্রিড পরিচালনাকারী সংস্থা জানিয়েছে, কী কারণে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। খবর সিএনএনের।
দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী ভিসেন্তে দে লা ও লেভি জানান, হাসপাতাল, পানি সরবরাহ, যোগাযোগসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো সচল রাখতে জরুরি ভিত্তিতে ছোট ছোট বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে ধাপে ধাপে জাতীয় গ্রিড পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে।
গত কয়েক বছরে একাধিকবার দেশব্যাপী বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে কিউবা। বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক দশক পুরোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন অবকাঠামো ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় সংকট দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে।
চলতি বছর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, যখন যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে কিউবার প্রধান তেল সরবরাহকারী দেশগুলো জ্বালানি পাঠানো কার্যত বন্ধ করে দেয়। এর ফলে মার্চ মাসেই এক সপ্তাহের ব্যবধানে অন্তত দুইবার জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দেয়।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) যুক্তরাষ্ট্রকে এই সংকটের জন্য দায়ী করেন।
দিয়াস-কানেল অভিযোগ করেন, জ্বালানি আমদানি কার্যত অবরুদ্ধ করে ওয়াশিংটন কিউবার জনগণকে চরম দুর্ভোগে ফেলতে এবং অর্থনৈতিক শ্বাসরোধের মাধ্যমে দেশে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চাইছে।
তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই নীতি কিউবার বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘অর্থনৈতিক শ্বাসরোধের কৌশল’।
দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে কিউবার স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, গণপরিবহন এবং ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে কিউবার অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। পর্যটক আগমনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রা আয় হ্রাস পেয়েছে।
ওয়াশিংটনের দাবি, কিউবার ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য হলো দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা উন্মুক্ত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা।
তবে কিউবা এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে বলছে, নিষেধাজ্ঞার মূল শিকার হচ্ছে সাধারণ জনগণ।
গত মাসে কিউবার জাতীয় পরিষদ অর্থনীতি উন্মুক্ত করতে একগুচ্ছ সংস্কার অনুমোদন দেয়। যদিও দেশটির পররাষ্ট্র বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, এসব সংস্কার বাইরের চাপের কারণে নয়, বরং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রয়োজন থেকেই নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র এসব সংস্কারকে ‘অনেক দেরিতে নেওয়া সীমিত ও প্রতীকী পদক্ষেপ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন অব্যাহত থাকলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মে মাসে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ হাভানায় কিউবার গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। একই সময়ে মার্কিন সাউদার্ন কমান্ডের প্রধানও গুয়ানতানামো নৌঘাঁটির সীমান্ত এলাকায় কিউবার সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
ওয়াশিংটনের অভিযোগ, কিউবায় রাশিয়া ও চীনের গোয়েন্দা নজরদারি কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থের বিরুদ্ধে। তবে কিউবা এ অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে।
কিউবার পররাষ্ট্র বাণিজ্য ও বিনিয়োগমন্ত্রী অস্কার পেরেজ-অলিভা ফ্রাগা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে সম্মিলিত শাস্তির শামিল।
অস্কার পেরেজ-অলিভা অভিযোগ করে বলেন, আজ কিউবার জনগণের বিরুদ্ধে যা ঘটছে, সেটি কার্যত একটি গণহত্যার সমতুল্য।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক