ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগে সাড়া দিচ্ছেন না পুতিন, আরও বড় হামলার আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিলেও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আপাতত শান্তি আলোচনায় আগ্রহী নন। বরং তিনি যুদ্ধ আরও জোরদার করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে ক্রেমলিন-ঘনিষ্ঠ তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
সূত্রগুলোর মধ্যে দুজন জানিয়েছেন, পুতিন আগামী কয়েক মাসের মধ্যে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনা দেখছেন। তাদের একজন, যিনি নিয়মিত রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, তিনি বলেন, আগামী মাসগুলোতে সংঘাত আরও বাড়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।
এই মন্তব্য এমন এক সময় এলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, পুতিন যুদ্ধ শেষ করতে চান এবং শান্তি চুক্তির কাছাকাছি রয়েছেন।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প পৃথকভাবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। পরে তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে জেলেনস্কির সঙ্গেও বৈঠক করেন তিনি। বৈঠক শেষে জেলেনস্কি জানান, তারা যুদ্ধের অবসান ত্বরান্বিত করার বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
তবে হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। ক্রেমলিন-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, পুতিন এখনও ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের ডনবাস অঞ্চল পুরোপুরি দখল করাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
সূত্রটির দাবি, সম্প্রতি যুদ্ধবিরতির ভিত্তিতে সমঝোতার পরামর্শ দেওয়া কয়েকজন উপদেষ্টাকে সরাসরি ভর্ৎসনা করেন পুতিন।
আরেকটি সূত্রের মতে, রুশ প্রেসিডেন্ট বিশ্বাস করেন, খুব শিগগিরই রাশিয়া পুরো ডনবাস নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হবে।
এর আগে জুন মাসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি যুদ্ধবিরতি ও সরাসরি বৈঠকের আহ্বান জানালেও তা প্রকাশ্যেই প্রত্যাখ্যান করেন পুতিন।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, রাশিয়া শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে থাকলেও প্রয়োজন হলে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
পেসকভ বলেন, রাশিয়া শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য প্রস্তুত। তবে নিজেদের সক্ষমতা ব্যবহার করে বিশেষ সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতাও আমাদের রয়েছে।
জেলেনস্কির কার্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী রাশিয়া শান্তির পরিবর্তে নতুন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তার দাবি, ইউক্রেনে আরও বড় আক্রমণের পাশাপাশি রাশিয়া ইউরোপের অন্য কোনো দেশেও হামলার পরিকল্পনা করতে পারে।
পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ডনবাস পুরোপুরি দখল করতে হলে রাশিয়াকে নতুন করে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ দিতে হতে পারে। তবে এটি রাশিয়ার অভ্যন্তরে অত্যন্ত অজনপ্রিয় একটি সিদ্ধান্ত।
এদিকে রাশিয়ার কিছু সামরিক বিশ্লেষক প্রকাশ্যেই বাল্টিক অঞ্চলে ন্যাটোর ঘাঁটি কিংবা ইউরোপীয় সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন।
লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক জ্যাক ওয়াটলিং বলেন, রাশিয়া সরাসরি ন্যাটোর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়াতে না চাইলেও সীমিত হামলার মাধ্যমে জোটের ভেতরে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করতে পারে।
তার ভাষায়, এ ধরনের হামলার উদ্দেশ্য ন্যাটোর সঙ্গে যুদ্ধ নয়, বরং জোটের সদস্যদের মধ্যে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে—সেই প্রশ্নে বিভক্তি তৈরি করা।
ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগার, তেল সংরক্ষণাগার ও বন্দরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটিতে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
দেশটির বহু অঞ্চলে পেট্রোল ও ডিজেলের ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং কিছু এলাকায় রেশনিংও চালু করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলার ফলে যুদ্ধের প্রভাব এখন সাধারণ রুশ নাগরিকদের জীবনেও স্পষ্টভাবে পড়তে শুরু করেছে।
গত সপ্তাহে রুশ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে পুতিন বলেন, ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার জবাবে রাশিয়া সীমান্তবর্তী আরও ইউক্রেনীয় অঞ্চল দখল করে একটি নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে পারে।
রাশিয়ার সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আন্দ্রেই ইলনিতস্কি সম্প্রতি এক নিবন্ধে দাবি করেন, যুদ্ধের পরবর্তী ধাপে ইউক্রেনের অন্তত ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ওডেসা বন্দর এবং বড় বড় ইস্পাত কারখানায় হামলা চালানো হতে পারে।
ইলনিতস্কি আরও বলেন, প্রয়োজনে বাল্টিক অঞ্চল, রোমানিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের এমন সামরিক স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে, যেখান থেকে ইউক্রেনের জন্য দীর্ঘপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হচ্ছে।
প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধে দুই পক্ষের বিপুল প্রাণহানি হলেও ডনবাসে রাশিয়ার অগ্রগতি ধীর হয়ে পড়েছে।
মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্রাটিজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিস (সিএসআইএস)-এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উভয় পক্ষের মিলিয়ে প্রায় ২০ লাখ সেনা নিহত, আহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ১৪ লাখই রুশ সেনা বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক