সিরিয়ায় এসডিএফের সঙ্গে সরকারের যুদ্ধবিরতি চুক্তি
কয়েকদিনের তীব্র সংঘর্ষের পর কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)-এর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে সিরিয়া সরকার। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই চুক্তির আওতায় এসডিএফ ইউফ্রেটিস নদীর পশ্চিমাঞ্চল থেকে তাদের বাহিনী প্রত্যাহার করবে এবং তাদের যোদ্ধারা ধাপে ধাপে সিরিয়ার জাতীয় সেনাবাহিনীতে একীভূত হবে।
স্থানীয় সময় রোববার (১৮ জানুয়ারি) হওয়া এই চুক্তি অনুযায়ী, এসডিএফ-নিয়ন্ত্রিত আল-হাসাকা, দেইর আজ-জোর ও রাক্কা—এই তিনটি পূর্ব ও উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় কার্যক্রম শুরু করবে। খবর আল জাজিরার।
দামেস্কে দেওয়া এক বক্তব্যে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা বলেন, আমরা আমাদের আরব গোত্রগুলোকে শান্ত থাকার এবং চুক্তির শর্ত বাস্তবায়নে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাচ্ছি।
চুক্তিতে বলা হয়েছে, আইএসআইএল (আইএস) বন্দি ও শিবিরগুলো দেখভাল করা এসডিএফ প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে একীভূত করা হবে। এর ফলে এসব শিবির ও বন্দিদের ওপর পূর্ণ আইনি ও নিরাপত্তা দায়িত্ব সরকারের হাতে চলে যাবে।
এ ছাড়া এসডিএফ কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক, নিরাপত্তা ও বেসামরিক পদে নিয়োগের জন্য একটি নামের তালিকা প্রস্তাব করবে, যাতে জাতীয় অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা যায়।
সিরিয়ায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত টম ব্যারাকের সঙ্গে আল-শারার বৈঠকের পর এই ঘোষণা আসে। এসডিএফ প্রধান মাজলুম আবদি বৈঠকে থাকার কথা থাকলেও আবহাওয়ার কারণে তার সফর সোমবার (১৯ জানুয়ারি) পর্যন্ত পিছিয়ে যায় বলে জানান আল-শারা। কুর্দি সংবাদমাধ্যম রুদাও জানিয়েছে, তিনি সোমবার দামেস্কে গিয়ে আল-শারার সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং ইতোমধ্যে দেইর আজ-জোর ও রাক্কা থেকে বাহিনী প্রত্যাহারে সম্মত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত টম ব্যারাক যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট আল-শারা নিশ্চিত করেছেন যে কুর্দিরা সিরিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আইএসবিরোধী লড়াইয়ে আমাদের ঐতিহাসিক অংশীদারদের সিরিয়ার সঙ্গে একীভূত হওয়াকে যুক্তরাষ্ট্র স্বাগত জানায়।
এদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানও আল-শারার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এবং দামেস্ককে সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন। তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরেই এসডিএফকে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে)-এর শাখা হিসেবে দেখে, যাকে তারা ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ বলে মনে করে।
দামেস্কের ‘বড় জয়’
আল জাজিরার দামেস্ক প্রতিনিধি আইমান ওঘান্না বলেন, এই যুদ্ধবিরতিকে ‘দামেস্ক ও তার মিত্র তুরস্কের জন্য একটি বড় বিজয়’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার মতে, এর ফলে রাক্কা, আল-হাসাকা ও দেইর আজ-জোর পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে এবং বেসামরিক প্রশাসনও দামেস্কের হাতে ফিরবে।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই চুক্তির আওতায় সীমান্ত ক্রসিং, তেল ও গ্যাসক্ষেত্রসহ সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিয়ন্ত্রণও সরকারের হাতে যাবে।
এর আগে মার্চে এসডিএফকে সেনাবাহিনীতে একীভূত করার একটি চুক্তি হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে বারবার সংঘর্ষ হয়েছে, যা এই মাসে আরও তীব্র আকার নেয়।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) সিরীয় সেনাবাহিনী এসডিএফ-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখে। তারা তাবকা শহর ও তার বাঁধ, রাক্কার পশ্চিমের গুরুত্বপূর্ণ ফ্রিডম বাঁধ এবং দেইর আজ-জোরের আল-ওমর তেলক্ষেত্র ও কনোকো গ্যাসক্ষেত্র দখলে নেয়।
গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট আল-শারা বলেছিলেন, দেশের এক-চতুর্থাংশ ভূখণ্ড ও প্রধান তেল-গ্যাস সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এসডিএফের হাতে থাকা ‘অগ্রহণযোগ্য’।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জামাল মানসুর আল জাজিরাকে বলেন, রাজনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ায় এসডিএফ দ্রুত পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। তার মতে, স্থানীয় আরব গোত্রগুলোর সমর্থন দুর্বল হয়ে পড়া এবং কুর্দি জাতীয়তাবাদী আধিপত্যের কারণে এসডিএফের অবস্থান আরও নড়বড়ে হয়ে যায়।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সিরিয়ার বাইরে থেকে আসা পিকেকে সংশ্লিষ্ট সব নেতাকর্মীকে এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক