পত্রিকার ভূমিকা ‘ভীতিকর’ ও ‘পুরোপুরি নজরদারি’ : প্রিন্স হ্যারি
লন্ডনের হাইকোর্টে আজ বুধবার (২১ জানুয়ারি) সাক্ষ্য দেওয়ার সময় ব্রিটিশ রাজকুমার হ্যারি ব্রিটেনের দুটি ট্যাবলয়েড পত্রিকার প্রকাশকের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন। এ সময় প্রাক্তন প্রেমিকা চেলসি ডেভির সঙ্গে তার সম্পর্কের ‘ভীতিকর’ কভারেজকে তিনি ‘পুরোপুরি নজরদারি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বহুল আলোচিত ও প্রতীক্ষিত ৯ সপ্তাহের এই বিচারের তৃতীয় দিনে, প্রিন্স হ্যারি অ্যাসোসিয়েটেড নিউজপেপারস লিমিটেডের (এএনএল) বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন। ডেইলি মেইল ও দ্য মেইলের প্রকাশকের বিরুদ্ধে তিনি এবং আরও ছয়জন অবৈধভাবে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ এনেছেন। তবে প্রকাশনা গোষ্ঠীটি তার এই দাবিগুলো বেশ জোরালোভাবেই অস্বীকার করেছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
আদালতে দেওয়া একটি বিবৃতিতে প্রিন্স হ্যারি জোর দিয়ে বলেন, ‘এই বিচার শুধু আমাকে নিয়ে নয়, বরং এটি বৃহত্তর জনস্বার্থের বিষয়।’ তিনি জানান, তার ঘনিষ্ঠ কেউ সংবাদমাধ্যমের কাছে তথ্য ফাঁস করছে—এমন সন্দেহ একটি ‘অবিশ্বাসের’ পরিবেশ তৈরি করেছিল, যার ফলে তার অন্য এক প্রেমিকা নাটালি পিঙ্কহামের সঙ্গে তার বিচ্ছেদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
প্রিন্স হ্যারি বলেন, ‘এর ফলে আমি বছরের পর বছর তার সঙ্গে কথা বলিনি... তবে আমি এখন বিশ্বাস করি যে এটি (প্রতিবেদনগুলো) আমাদের কথোপকথনে আড়ি পাতা, ভয়েসমেইল ইন্টারসেপশন অথবা ছদ্মবেশ ধারণ করে তথ্য হাতানোর মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছিল।’
চেলসি ডেভির সঙ্গে তার প্রেমের কথা উল্লেখ করে প্রেন্স হ্যারি তার বিবৃতিতে বলেন, বিশেষ করে দুজন সাংবাদিকের কভারেজ ছিল নিপীড়নমূলক। তিনি বলেন, ‘তারা সব জায়গায় হাজির হতো। একে পুরোদস্তুর স্টকিং (আড়িপাতা) এবং অবিরাম নজরদারি মনে হতো... এই ধরনের অনুপ্রবেশ চেলসির জন্য ছিল ভীতিকর।’
প্রিন্স হ্যারি আরও বলেন, ‘এটি তাকে এমন এক অনুভূতি দিয়েছিল যেন তাকে শিকার করা হচ্ছে এবং প্রেস তাকে ধরে ফেলেছে। এটি আমার জন্যও ভীতিজনক ছিল কারণ এটি বন্ধ করার জন্য আমার কিছুই করার ছিল না।’
সমকামী পপ আইকন এলটন জন এবং তার স্বামী ডেভিড ফার্নিশসহ আরও ছয়জন হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির সঙ্গে হ্যারি এ মামলাটি করেছেন। ব্রিটিশ মিডিয়ার বিরুদ্ধে তার দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে এটিই রাজকুমারের শেষ সক্রিয় আইনি মামলা। কাঠগড়ায় ওঠার সময় উন্মুক্ত বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘সত্য, ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিতার অনুপ্রেরণা থেকে এই দাবি জানানোর পেছনে অবশ্যই একটি ব্যক্তিগত দিক রয়েছে, তবে এটি কেবল আমাকে নিয়ে নয়, এখানে একটি সামাজিক দিকও রয়েছে, এটি সেই হাজার হাজার মানুষকে নিয়ে যাদের জীবন লোভের কারণে আক্রান্ত হয়েছে।’
গাঢ় স্যুট এবং স্ট্রাইপ টাই পরা ৪১ বছর বয়সী প্রিন্স হ্যারি বেলা শেষের দিকে লন্ডনের হাইকোর্টে কাঠগড়ায় দাঁড়ান। এএনএলের আইনজীবী দলের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার আগে তিনি বাইবেলের ওপর হাত রেখে শপথ নেন। ২০২৩ সালে মিরর গ্রুপ নিউজপেপারসের (এমজিএন) বিরুদ্ধে হ্যাকিং মামলায় সফলভাবে সাক্ষ্য দিয়ে তিনি এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো প্রথম জ্যেষ্ঠ ব্রিটিশ রাজকীয় সদস্য হিসেবে ইতিহাস গড়েছিলেন। গত বছর, অন্য একটি নির্ধারিত বিচারের ঠিক আগে, রুপার্ট মারডকের মারিকানাধীন ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড প্রকাশক এনজিএন ফোন হ্যাকিংসহ ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের জন্য প্রিন্স হ্যারিকে ‘উল্লেখযোগ্য পরিমাণ’ ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হয়েছিল।
মামলায় অভিনেতা লিজ হার্লি ও সেডি ফ্রস্টসহ সাত সুপরিচিত ব্যক্তি এএনএল প্রকাশকের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ভয়েসমেইল বার্তা আটকে দেওয়া, ফোনে আড়ি পাতা এবং প্রতারণামূলকভাবে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ এনেছেন। তারা অভিযোগ করেছেন যে, বেশ কিছু খবর তৈরির জন্য অবৈধ তথ্য সংগ্রহ করতে প্রতিষ্ঠানটি এমন কিছু ব্যক্তিগত তদন্তকারীদের অর্থ প্রদান করেছে যারা এর আগে অন্যান্য ফোন-হ্যাকিং মামলাতেও জড়িত ছিল। এই অভিযোগগুলো করা হয়েছে ১৯৯৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে। তবে এএনএল ধারাবাহিকভাবে দাবিগুলো অস্বীকার করে সেগুলোকে ‘ভীতিকর’ ও ‘অবাস্তব’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
রাজা তৃতীয় চার্লসের ছোট ছেলে রাজকুমার হ্যারি দীর্ঘকাল ধরে ব্যক্তিজীবনে গণমাধ্যমের অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে সরব। ১৯৯৭ সালে প্যারিসে পাপারাজ্জিদের এড়িয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টার সময় গাড়ি দুর্ঘটনায় তার মা প্রিন্সেস ডায়ানার মৃত্যুর জন্য তিনি সাংবাদিকদেরই দায়ী করেন। ১৯৯৩ সালে বর্ণবাদী হামলায় নিহত স্টিফেনের মা ডরিন লরেন্স এবং প্রাক্তন রাজনীতিবিদ সাইমন হিউজ হলেন বাকি দুজন অভিযোগকারী।
এই সাতজনের প্রতিনিধিত্বকারী ডেভিড শেরবোর্ন সোমবার হাইকোর্টকে বলেন, তিনি প্রমাণ করতে চান এএনএল অবৈধভাবে তথ্য সংগ্রহের জন্য স্পষ্ট এবং পদ্ধতিগত পন্থা ব্যবহার করেছিল।
এ বিষয়ে এএনএলের আইনজীবী অ্যান্টনি হোয়াইট পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, প্রকাশিত ৫০টিরও বেশি প্রতিবেদনের তথ্য সাংবাদিকরা কীভাবে সংগ্রহ করেছেন তা প্রমাণের জন্য সাক্ষীদের সাক্ষ্য প্রদানের মাধ্যমে ব্যাখ্যা প্রদান করা হবে।
মঙ্গলবার অ্যান্টনি হোয়াইট বলেছিলেন, ব্যক্তিগত তদন্তকারীদের অর্থ প্রদানের অভিযোগগুলো ছিল ‘অন্ধকারে ঢিল ছোড়া’র মতো।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক