মধ্যপ্রাচ্যে কী পরিস্থিতিতে আছেন অভিবাসীরা?
ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র বনাম ইরান যুদ্ধে উত্তপ্ত হয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্য৷ একদিকে ইরানের বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা, অন্যদিকে ইরান থেকে ড্রোন ও মিসাইল হামলায় বারবার কেঁপে উঠছে এ অঞ্চল৷ বাংলাদেশের এক কোটি অভিবাসীর সিংহভাগই থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে৷ উদ্ভুত এই পরিস্থিতি নিয়ে তাদের কয়েকজন কথা বলেছেন ডয়চে ভেলের সঙ্গে৷ এছাড়াও ডয়চে ভেলের ফেসবুক পাতায় মন্তব্য করেছেন অনেকে৷
কাতার
কাতারের রাজধানী দোহায় ফুড ডেলিভারির কাজ করেন নাজমুল তালুকদার৷ শনিবার দুপুর বারোটার দিকে প্রথম এলার্ট পান তিনি৷
নাজমুল তালুকদার ডয়চে ভেলেকে বলেন, “শনিবার প্রথম যে এলার্টটা পাই সেটি ছিল কাতারের স্থানীয় সময় ১২টা ০৪ মিনিটে। আমি আমার ব্যক্তিগত কাজে বাইরে ছিলাম৷ একই সাথে কিছু সময় পরে আবারও ‘হাই এর্লাট’ আসে৷ তার ২০-২৫ মিনিট পরেই আকাশে ভীষণ শব্দ শুরু হয়৷”
নাজমুল তালুকদার আরো বলেন, ‘‘দিন হওয়াতে সেভাবে বোঝা না গেলেও আকাশে ধোঁয়ার কুন্ডুলি দেখা যায়৷ এরপর থেকে লাগাতার হামলা চলে, (৩০ মিনিট ৪৫ মিনিট) পরপর৷ সেহরির আগে অব্দি চলে৷ রাতে এই হামলার ভয়াবহতা আরো বোঝা যায়৷ রোববার সকালেও মোবাইলে অ্যালার্ট পান নাজমুল৷”
“রোববার সকালেও আবার অ্যালার্ট করা হয় এবং পাঁচ বার বিস্ফোরণ হয়৷ কিছু সময় পরে সানায়া নামক জায়গায় বিশাল ধোঁয়ার কুন্ডুলি দেখা যায়৷ একটু আগে (স্থানীয় সময় দুপুর ২টার দিকে) আবার তিনটা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে৷”
স্বাভাবিক ভাবেই বাংলাদেশি কমিউনিটিসহ সবাই বেশ কিছুটা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় আছেন৷
ডয়চে ভেলের ফেসবুক পোস্টেও কাতার থেকে অনেকে মন্তব্য করেছেন৷
লিটন হুসেন লিখেছেন, ‘‘কখনো গভর্নমেন্ট থেকে সাইরেন আসতেছে মোবাইলফোন নম্বরে। কখনো আকাশে বিকট শব্দ এভাবে চলছে আজকের দিন৷”
আরাফাত হোসাইন মিলাদ লিখেছেন, ‘‘বিকট শব্দে বোমাবর্ষণ বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের শব্দে আমরা রাতে ঘুমাতে পারিনি৷ কিছু জায়গায় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেলেও আশার কথা হলো, এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো প্রবাসী ভাই-বোনের বড় কোনো ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি৷”
আরাফাত হোসাইন মিলাদ প্রবাসীদের আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন, ‘‘কাতার সরকারের নির্দেশনা মেনে চলুন এবং অপ্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকুন৷”
বাহরাইন
মানামায় চায়না মার্কেটে কাজ করেন এবং সে এলাকায় থাকেন বাংলাদেশি অভিবাসী মোহাম্মদ হোসেন কাজী৷ তিনি ডয়চে ভেলেকে টেলিফোনে বলেন, ‘‘গত রাতে অবস্থা বেশি খারাপ ছিল৷ আমি যে ভবনে থাকি তার ওপর দিয়ে ইরানের মিসাইলগুলো যেতে দেখেছি৷ মূলত মানামায় আমেরিকার ঘাঁটির (নৌবহর কমান্ড) দিকে হামলা করেছে৷ তো সেগুলো আমাদের ভবনের ওপর দিয়ে যায়৷ বাহরাইন আবার সেগুলো প্রতিহত করছিল৷ খুব আতঙ্কে ছিলাম কাল৷ আমরা রাতে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলাম৷ সব দেখেছি৷”
মানামার বিমানবন্দরেও হামলা হয়েছে, তবে তাতে খুব একটা ক্ষতি হয়নি বলে জানান আরাফাত হোসাইন মিলাদ৷
রোববার সকাল ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার দিকে মানামার ক্রাউন প্লাজায় হামলা হয়েছে৷ সব মিলিয়ে মানামার কয়েকটি এলাকায় হামলা হয়েছে বলে জানান হোসেন কাজী৷
আরব আমিরাত
দুবাই থেকে মাহাবুব আলম ডয়চে ভেলের পোস্টে লিখেছেন, ‘‘আমি দুবাই শহরের পাম জুমেইরাতে থাকি, আমার থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরে বিশ্বের উচু ভবন বুরজ খলিফা রয়েছে৷ এর আশে পাশে একটা পাঁচ তারকা মানের হোটেলে গতকাল সন্ধ্যা ৬:৩০ এর পর হামলা হয়েছে। আমি বিকট শব্দ শুনেছি। তখনও কিছু বুজতে পারিনাই। আমার থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে রয়েছে বুরজ আল আরব উঁচু ভবন৷ সেখানেও গতকাল সন্ধ্যায় হামলা হয়েছে। অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, অগ্নিকুণ্ড দেখা গেছে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দুবাই জাবেল আলী বন্দরে একাধিক বার হামলা হয়েছে৷ তবে বন্দরের কোমল পানীয় এবং খাবারের কন্টিনারগুলো বেশ ক্ষতি হয়েছে। রাস্তায় জরুরি সেবার হর্ন শোনা যাচ্ছে৷ তবে সবকিছু শিথিল রয়েছে৷”
দুবাইয়ের বাসিন্দা মো. আরদুল হক লিখেছেন, ‘‘সকালে আমাদের কোম্পানির অফিসের কাছেই মনে হয় ১০০ গজ দূরেই একটি ড্রোন আঁছড়ে পড়ে৷ তখন মনে হয়েছিল এই বুঝি অফিসের ওপরেই পড়ল৷ খুব ভয় পেয়ে বাইরে এলাম৷”
মাসুর রানা লিখেছেন, ‘‘আমি গতকাল দুবাই বুর্জ খলিফা সংলগ্ন জাবেল এরিয়াতে ইফতার এর পরে তিনটি মিসাইল সদৃশ বস্তু আকাশে উড়তে দেখি৷”
মোহিব মিয়াজি লিখেছেন, ‘‘আবুধাবী আল দাপরা এয়ারবেজে হামলা হচ্ছে৷ আমার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে সব মিসাইল৷ চোখের সামনে ধংসাত্মক যুদ্ধ দেখছি৷ ছোটকালে বাপচাচারা রাত ১০টায় ভয়েস অফ আমেরিকার খবর শুনতেন; সবাই মিলে ইরাক-ইরান যুদ্ধের খবর৷ আর এখন নিজে স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি৷”
তোফাজ্জেল হোসেন বাবলু লিখেছেন, ‘‘আবুধাবিতে আমেরিকান ঘাঁটির কাছাকাছি আছি এবং আতঙ্ক বিরাজ করছে। মোবাইল সাইরেন বাজার সাথে সাথে বাইরে খোলা জায়গা চলে যেতে হয়৷”
কুয়েত
শনিবার থেকে কুয়েতেও বেশ কিছু হামলার ঘটনা ঘটেছে৷ সেখানে একটি ড্রোন হামলায় চার বাংলাদেশি শ্রমিক আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়৷ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর বাংলদেশি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আহতদের অবস্থা ততটা গুরুতর নয়৷
ডয়চে ভেলের ফেসবুক পোস্টে অবশ্য কুয়েত প্রবাসীরা লিখেছেন, তাদের মধ্যে কিছুটা শঙ্কা-ভয় কাজ করছে৷ তবে তারা এখনও নিরাপদে আছেন৷
মোবাশ্বের হাসান লিখেছেন, ১১টার দিকে সাইরেন বেজে ওঠায় বাইরে থাকাতেই আজব শব্দের হুঙ্কারে জনমনে ভয় ও নিরাপদ অবস্থানে আশ্রয় নিতে দেখা যায়৷ কিছুটা সময় আকাশ অশান্ত ছিল। তবে দুপুরের দিকে এ প্রতিবেদন লেখার সময় কুয়েত শান্ত রয়েছে৷ একই ধরনের মন্তব্য করেছেন হাসান আল মামুন৷
করিম মোহাম্মদ আলী লিখেছেন, ‘‘মাঝে মাঝে সাইরেন এর শব্দ শুনলে বুকটা কেঁপে ওঠে৷”
রুবেল শরীফ লিখেছেন, ‘‘কুয়েতের বাঙালি সম্প্রদায়ের মধ্যে অহেতুক চাপা উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা দেখতে পাই৷ কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে নিরাপদ মনে করছি৷ এখানে জীবনযাপন পুরোপুরি স্বাভাবিক৷”
এর বাইরে ওমান, জর্ডান, সৌদি আরব ও ইসরায়েল থেকেও প্রবাসীরা লিখেছেন৷
কৈলাশ রয় পার্থ লিখেছেন, ‘‘জর্ডানে কিছুক্ষণ পরপর সাইরেন বাজে৷”
ওমান থেকে মোহাম্মদ নিজাম লিখেছেন, ‘দুটো ড্রোন দুকম বন্দরে আঘাত করেছে৷’
হাসানুর রহমান লিখেছেন, ‘সৌদি আরবে জেদ্দার অবস্থা স্বাভাবিক৷’
ইসরায়েল থেকে অজয় চন্দ্র লিখেছেন, ‘‘আমি ইসরায়েলে আছি, নিরাপদে আছি, কিন্তু কিছুটা উৎকণ্ঠায় আছি৷”
ডয়চে ভেলে ইরানে অভিবাসীদের অবস্থা সম্পর্কেও জানার চেষ্টা করছে৷

ডয়চে ভেলে