যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যেভাবে ইরানকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধকে সাধারণত সামরিক শক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কিংবা পারমাণবিক ঝুঁকির মতো কৌশলগত ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়। কিন্তু এই যুদ্ধের গভীরে রয়েছে এক নৈতিক ও আদর্শিক জগৎ। এটি না বুঝলে ইরানের টিকে থাকার লড়াই বা প্রতিরোধের ধরন বোঝা অসম্ভব।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর ধারাবাহিক হামলায় ইরানের সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশটির আদর্শিক ও নৈতিক ভিত্তিকে ভিন্নভাবে শক্তিশালী করে তুলছে। কারণ, ইরান কেবল একটি আক্রান্ত রাষ্ট্র নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা যার আদর্শিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে ইসলাম ধর্মের ‘আত্মত্যাগ’, ‘প্রতিরোধ’ ও ‘শাহাদাতের’ বিশ্বাসের ওপর।
এই দীর্ঘ যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও ইরানের টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে আলজাজিরায় প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন নিচে তুলে ধরা হলো। প্রতিবেদনটি লিখেছেন লন্ডনের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির দর্শন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হোসেন দাব্বাগ।
১. শাহাদাত ও আত্মত্যাগের সংস্কৃতি
রমজান মাসে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের কট্টরপন্থীরা রাতভর শোকানুষ্ঠান পালন করছে। এমনকি যখন ওপর থেকে বোমা পড়ছে, তখনও তারা বিচলিত নয়। বিশেষ করে আধাসামরিক বাহিনী ‘বাসিজের’ সদস্যদের কাছে মৃত্যু কোনো পরাজয় নয়, বরং একটি ‘পবিত্র সাক্ষ্য’ বা শাহাদাত। এই ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাসই তাদের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার রসদ জোগায়।
২. কারবালার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ইরানের রাজনৈতিক ও নৈতিক কাঠামোর মূলে রয়েছে ৬৮০ খ্রিস্টাব্দের কারবালার যুদ্ধের স্মৃতি। ইমাম হোসেনের (রা.) আত্মত্যাগ তাদের শেখায়, নিপীড়ন মানেই পরাজয় নয়। বরং সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে কষ্ট সহ্য করা বা মৃত্যু বরণ করাও এক ধরনের নৈতিক বিজয়। এই ‘ন্যায়পরায়ণ ভিকটিম’ বা মজলুমের ইমেজ ইরানকে কয়েক দশক ধরে সাম্রাজ্যবাদ ও বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বৈধতা দিয়েছে।
৩. বাহ্যিক শক্তি বনাম অভ্যন্তরীণ সংহতি
বাইরের দেশগুলো যখন মনে করে সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানকে গুঁড়িয়ে দেওয়া যাবে, তখন ইরানের ভেতরে এর উল্টো প্রতিক্রিয়া হতে পারে। বিদেশি আক্রমণ অনেক সময় ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভেদ কমিয়ে দেয়। যারা বর্তমান সরকারের দমন-পীড়নের বিরোধী, তারাও জাতীয়তাবাদ বা সামষ্টিক শাস্তির ভয়ে বিদেশি আক্রমণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারে। এর ফলে রাষ্ট্র নিজেকে ‘শাসক’ থেকে ‘জাতির রক্ষক’ হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পায়।
৪. ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ ও সহনশীলতার কৌশল
ইরানের বর্তমান কৌশল হলো ‘দীর্ঘমেয়াদী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ’ । তারা বিশ্বাস করে, ওয়াশিংটন বা তার মিত্রদের রাজনৈতিক সংকল্পের চেয়ে তাদের সহনশীলতা বেশি। ৮ বছরের ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাদের শিখিয়েছে কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী বাহ্যিক চাপ সহ্য করে টিকে থাকতে হয়। বর্তমান বোমাবর্ষণের মধ্যেও ইরানের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর ভেঙে পড়ার কোনো দৃশ্যমান লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
৫. ট্রাম্পের ‘শর্তহীন আত্মসমর্পণ’ ও ইরানের আখ্যান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘শর্তহীন আত্মসমর্পণের’ দাবি ইরানকে একটি আদর্শ শত্রু খুঁজে পেতে সহায়তা করেছে। ধর্মনিরপেক্ষ সামরিক চিন্তায় সহিংসতা কোনো শক্তির সক্ষমতা ধ্বংস করে। কিন্তু রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক চিন্তায় এই সহিংসতাই ‘পবিত্র উদ্দেশ্যকে’ আরও সুদৃঢ় করে। অবকাঠামো বা কমান্ডার হারালেও ইরান প্রতীকীভাবে ‘শাহাদাতের ভাষা’ ফিরে পায়, যা তাদের টিকে থাকার মূল শক্তি।
সব শেষে বলা যায়, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করতে পারে। এটি হয়তো দেশটির বস্তুগত ভিত্তি বা অবকাঠামোকে দুর্বল করবে, কিন্তু যে ‘পবিত্র আখ্যানের’ ওপর ভিত্তি করে দেশটি দাঁড়িয়ে আছে, তাকে আরও শক্তিশালী করবে। ইরান যখন পালটা আঘাত হানে তখন তারা শক্তিশালী, আর যখন তারা এই আক্রমণ সহ্য করে তখন তারা আরও বেশি শক্তিশালী—কারণ তারা তাদের জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হয়, এই টিকে থাকাই এক ধরনের বিজয়।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক