ট্রাম্প-শি বৈঠক : জাঁকজমকের আড়ালে কূটনৈতিক অগ্রগতির ঘাটতি
বিশ্বের দুই পরাশক্তির শীর্ষ নেতারা ওয়াশিংটন ডিসিতে এক বৈঠকে মিলিত হওয়ার সময়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে জমকালো সংবর্ধনা ও জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতায় ভূষিত করেন।
দুই নেতার বহুল প্রতীক্ষিত এ বৈঠকের মূল বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
মূল বিষয়বস্তুর চেয়ে জাঁকজমকই মুখ্য
ট্রাম্প শির সাথে তাঁর গভীর বন্ধুত্বের প্রশংসা করেন এবং চীনা প্রেসিডেন্টকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে কোনো ত্রুটি রাখেননি। তিনি রানওয়েতেই উপস্থিত হয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান, প্রেসিডেন্সিয়াল হেলিকপ্টারে বিরল ভ্রমণের সুযোগ দেন এবং একটি আমেরিকান ইগল পাখির মূর্তি উপহার দেন।
তবে এই বাহ্যিক জাঁকজমক কিন্তু কূটনৈতিক অগ্রগতি বা সাফল্যের ঘাটতিকেই আড়াল করেছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের রায়ান হাসের মতে, এই জাঁকজমকই ছিল মূল উদ্দেশ্য। সূচি থেকে সামরিক পরিদর্শন এবং উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বাদ দিলে দেখা যাবে, দুই নেতা পরস্পরের সাথে সরাসরি আলোচনার জন্য দুই ঘণ্টারও কম সময় পেয়েছেন।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মতে, এই বৈঠকগুলোতে অনেক নতুন বিষয়ে ঐকমত্য অর্জিত হয়েছে—তবে যেসব একমাত্র দৃশ্যমান বা বাস্তব চুক্তির ঘোষণা এসেছে, তা হলো বিনিময়ের অংশ হিসেবে এক লাখ তরুণ আমেরিকানকে চীনে আসার আমন্ত্রণ জানানো এবং আটলান্টার একটি চিড়িয়াখানায় দুটি পান্ডা ধারে দেওয়া।
এ প্রসঙ্গে রায়ান হাস বলেন, ‘মূল বিষয় ছিল দুই নেতা যে প্রতিযোগিতাকে সহনীয় সীমার মধ্যে রেখে কার্যকরভাবে মার্কিন-চীন সম্পর্ক পরিচালনা করতে পারেন—তা বিশ্বকে দেখানো।’
শি জিনপিং আবারও উভয় পক্ষকে ‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’ তত্ত্ব এড়িয়ে চলার আহ্বান জানান। এই তত্ত্বে বলা হয়েছে- একটি উদীয়মান শক্তি নিশ্চিতভাবেই পুরোনো প্রতিষ্ঠিত শক্তির সঙ্গে সংঘাত জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তারপরও তাইওয়ান বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়ে অগ্রগতির খুব একটা লক্ষণ দেখা যায়নি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঘিরে উত্তেজনা
ট্রাম্প এবং শি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের মতভেদের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ট্রাম্প এআই-কে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নেতাদের এই প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণের দাবি ট্রাম্প উড়িয়ে দিলেও, শি বলেছেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত।
সিঙ্গাপুরের নানিয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির ডিলান লোহের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে তৈরি হওয়া ঝুঁকি সম্পর্কে সাধারণ একটি ব্যাপক সম্মতি রয়েছে ঠিকই, কিন্তু কীভাবে এটি পরিচালনা করা হবে তা নিয়ে দুই দেশের পথ ভিন্ন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গভীর সন্দেহ এবং তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে এই প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কোনো বড় ধরনের সাফল্য আসার সম্ভাবনা নেই বলেই মন্তব্য করেন ডিলান লোহ।
বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি
এই বৈঠকের একটি উল্লেখযোগ্য চুক্তি ছিল দুই দেশের ভঙ্গুর বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি দুই মাসের জন্য বাড়ানো। এটি আগামী নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
এই সাময়িক শান্তিচুক্তি বা যুদ্ধবিরতিটি গত বছর চীনা পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক কমিয়ে এবং উৎপাদনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় দুর্লভ খনিজ রপ্তানিতে বেইজিংয়ের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে দুই দেশের মধ্যকার ধ্বংসাত্মক বাণিজ্য যুদ্ধকে থামিয়ে দিয়েছিল।
এ বিষয়ে ডিলান লোহ বলেন, ‘আমি মনে করি চীনারা হয়তো আরও দীর্ঘ মেয়াদের জন্য মেয়াদ বাড়ানোর আশা করেছিল, তবে তারা বাস্তববাদীও বটে। তবে, এই যুদ্ধবিরতি বাণিজ্য ক্ষেত্রে কিছুটা প্রশান্তি প্রদান করবে।’
ইউনিভার্সিটি অব সিডনির ইউনাইটেড স্টেটস স্টাডিজ সেন্টারের গবেষণা পরিচালক জ্যারেড মন্ডশেইনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র মূলত যতক্ষণ বেইজিংয়ের ওপর থেকে তার দুর্বলতাগুলো কমাতে না পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ট্রাম্প সাময়িকভাবে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন।
স্বঘোষিত চুক্তি-নির্মাতা ট্রাম্প আরও একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য চীনকে আরও বেশি মার্কিন পণ্য কেনার জন্য বারবার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে, শির এই সফর থেকে চীন এখনো পর্যন্ত বোয়িং বিমান কিংবা মার্কিন কৃষি পণ্য ক্রয়ের ব্যাপারে কোনো দৃশ্যমান অঙ্গীকার নিশ্চিত করেনি।
ইরান সংকট
ইরানের সাথে সংঘাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে মুক্ত করতে এবং বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করতে ট্রাম্প বারবার চীনের সহায়তা চেয়েছেন—তবে বেইজিং এই আহ্বান প্রত্যাখান করেছে।
এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করতে ইরানকে সাহায্য করার অভিযোগও রয়েছে চীনের বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকের এক চীনা বিবরণী অনুযায়ী, শি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অবিলম্বে যুদ্ধ শেষ করার এবং তেহরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তিতে পৌঁছানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের ইউএস-এশিয়া সম্পর্কের অধ্যাপক রানা মিটার বলেন, ‘চীন অনেক বড় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রকাশ্যে এসে সমাধান বের করবে—এমনটা ভাবা একেবারেই অবাস্তব। আমার মনে হয় না এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রকে সংকট থেকে বের করে আনতে চীন কোনো জাদুকরী ভূমিকা রাখবে।’
তাইওয়ান ইস্যু
গত মে মাসে ট্রাম্পকে দেওয়া সতর্কবার্তার পুনরাবৃত্তি করে শি বলেন, তাইওয়ান প্রশ্নে ট্রাম্পকে ‘সতর্কতা’ দেখানো উচিত। তবে তিনি ওই বৈঠকের চেয়েও আরও এক ধাপ এগিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার স্পষ্ট বিরোধিতা করার অনুরোধ জানান।
দ্বীপদেশ তাইওয়ানকে চীন নিজের ভূখণ্ড বলে দাবি করে এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তবে তাইওয়ান নিজের সুরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বুধবার জানিয়েছেন যে, তাইওয়ানের জন্য নির্ধারিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন অস্ত্র প্যাকেজ স্থগিত রাখা হয়েছে এবং তা পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে।
গত মে মাসে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, এই অস্ত্র বিক্রি চীনের সাথে দর কষাকষির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, যা তাইওয়ানের নিরাপত্তাকে সস্তা দামে বিকিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল।
হার্ভার্ডের রানা মিটার বলেন, ‘ট্রাম্প আগের প্রশাসনগুলোর তুলনায় অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ নিয়ে এমনভাবে কথা বলতে ইচ্ছুক ছিলেন, যা অতীতে দেখা যায়নি। কিন্তু তাইওয়ানের প্রতি মার্কিন নিরাপত্তার যে প্রতিশ্রুতি বা আশ্বাস রয়েছে, তার নীতিগত কোনো মৌলিক পরিবর্তন হওয়ার কোনো লক্ষণ আমি দেখছি না।’

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক