মাঝ আকাশে ইঞ্জিন বিকল, তবুও ইতিহাস গড়ল ইলন মাস্কের ‘স্টারশিপ’
মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় সূচনা করেছে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্স। প্রতিষ্ঠানটির তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও বৃহত্তম রকেট ‘স্টারশিপ’ প্রথমবারের মতো সফলভাবে পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছেছে।
স্থানীয় সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) নিজেদের চতুর্দশ (১৪তম) পরীক্ষামূলক চালনায় এই ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করে স্টারশিপ। একই সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে মহাকাশে স্পেসএক্সের নতুন প্রজন্মের ২৬টি ‘স্টারলিঙ্ক ভি৩’ কৃত্রিম উপগ্রহ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। খবর রয়টার্সের।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ব্রাউনসভিলে অবস্থিত স্পেসএক্সের ‘স্টারবেস’ কেন্দ্র থেকে ৪০তলা ভবনের সমান উঁচু এই রকেটটি উৎক্ষেপণ করা হয়। বিশাল এই রকেটটিতে প্রধানত দুটি অংশ ছিল— নিচের স্তরের ‘সুপার হেভি’ বুস্টার এবং ওপরের মূল ‘স্টারশিপ’ মহাকাশযান।
উৎক্ষেপণের পর রকেটের সুপার হেভি বুস্টারটি মূল স্টারশিপ যানটিকে নিরাপদে মহাশূন্যে ঠেলে দিয়ে মেক্সিকো উপসাগরের পানিতে ল্যান্ড করে। তবে অবতরণের সময় এর কয়েকটি ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে, মহাকাশে পৌঁছানোর পর স্টারশিপের মূল তিনটি ইঞ্জিনের একটি বিকল হয়ে পড়ে।
ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ফলে মিশনটি নির্ধারিত ১০ ঘণ্টার পরিবর্তে কমিয়ে ৩ ঘণ্টায় নিয়ে আসা হয়। শুরুতে স্পেসএক্সের মুখপাত্র ড্যান হুওট সরাসরি লাইভ স্ট্রিমে জানান যে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রকেটটি হয়তো কক্ষপথে পৌঁছাতে পারবে না। কিন্তু এর কয়েক মিনিট পরেই প্রকৌশলীরা পরিস্থিতি সামাল দেন। অন্য ব্যাকআপ ইঞ্জিনগুলো চালু করে তারা স্টারশিপকে নির্ধারিত কক্ষপথে পাঠাতে সক্ষম হন।
কক্ষপথে পৌঁছানোর পর বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বহন করা ২৬টি ‘স্টারলিঙ্ক ভি৩’ উপগ্রহ মহাকাশে নির্দিষ্ট স্থানে প্রতিস্থাপন করা হয়। এক্স (সাবেক টুইটার) বার্তায় ইলন মাস্ক লেখেন, ২৬টি স্টারলিঙ্ক ভি৩ বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট তাদের নির্ধারিত কক্ষপথে সঠিকভাবে কাজ শুরু করেছে।
এর আগে ২০২৩ সাল থেকে পরিচালিত স্টারশিপের বিগত ১৩টি পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন কেবল ‘সাব-অরবিটাল’ বা উপ-কক্ষপথেই সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে এটিই ছিল সম্পূর্ণ নতুন নকশার ও উচ্চমানের স্টারশিপের প্রথম বাণিজ্যিকভাবে অর্থ উপার্জনকারী মিশন। এটি সফলভাবে শেষ করে রকেটটি প্রশান্ত মহাসাগরের পানিতে নিয়ন্ত্রিতভাবে অবতরণ করে। ল্যান্ড করার সময় রকেটের গোড়ায় আগুন ধরে যায় এবং এটি সাগরে আছড়ে পড়ে ভেঙে যায়। অবশ্য পানির নিচ থেকে রকেটটির ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করার কোনো পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল না।
মহাকাশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উড্ডয়ন কেবল একটি পরীক্ষামূলক মিশন ছিল না। বরং এতে কোটি কোটি ডলার মূল্যের স্যাটেলাইট থাকায় এটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি বাণিজ্য অভিযান। স্পেসএক্সের এই সাফল্য তাদের মহাকাশ ব্যবসায় এক নতুন বার্তা দিল।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, একবারে ২৬টি নতুন ভি৩ স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠাতে পারায় স্পেসএক্সের স্টারলিঙ্ক সেবা থেকে সামনে শত কোটি ডলার রাজস্ব আয় হবে। এই ভি৩ স্যাটেলাইটগুলো আগের মডেলগুলোর চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি ডেটা আদান-প্রদান করতে সক্ষম। আগামীতে স্টারশিপ পুরোদমে নিয়মিত কাজ শুরু করলে একসঙ্গে অন্তত ৬০টি করে স্যাটেলাইট পাঠাবে স্পেসএক্স।
উল্লেখ্য, গত জুন মাসে রেকর্ড পরিমাণ আইপিও নিয়ে পুঁজিবাজারে আসার পর স্পেসএক্স মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ষষ্ঠ সর্ববৃহৎ কোম্পানিতে পরিণত হয়। এর ফলে কোম্পানিটির বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২ ট্রিলিয়ন (২ লাখ কোটি) ডলারে। এর মাধ্যমেই ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা ইলন মাস্ক বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার বা শতকোটিপতি হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান স্টারশিপের এই অভাবনীয় অর্জনে স্পেসএক্সকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এই স্টারশিপ রকেটের ওপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতে চাঁদে ও মঙ্গলগ্রহে মানুষ পাঠানোর ঐতিহাসিক পরিকল্পনা করছে নাসা ও স্পেসএক্স।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক