হামলা হলে সীমাহীন পাল্টা আক্রমণের হুঁশিয়ারি ইরানের
ইরানে নতুন করে যুদ্ধ শুরু ঠেকাতে যখন কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে, তখন দেশটির সশস্ত্র বাহিনীকে কঠোর বার্তা দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের ওপর আবার হামলা হলে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই তাৎক্ষণিক ও কার্যকর জবাব দিতে হবে।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (৩০ অক্টােবর) তেহরানে কাতারের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকেরা দীর্ঘ বৈঠক করেছেন। শনিবারও (৩১ অক্টােবর) আলোচনা অব্যাহত ছিল। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে নতুন করে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এমন খবরের মধ্যে তেহরান জানিয়েছে, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত। খবর আল জাজিরার।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয় শনিবার জানায়, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মোজতবা খামেনি। এ সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত নির্দেশনা দেন। গত মার্চে বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দায়িত্ব নেওয়া মোজতবাকে এরপর থেকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি বা তার বক্তব্যও শোনা যায়নি।
সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের ওপর আবার হামলা হলে ‘সর্বোচ্চ প্রতিরোধ সক্ষমতা’ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা ছাড়াই তাৎক্ষণিক ও কার্যকর পাল্টা জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি রাখতে হবে।
এর কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তেহরানে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। চিঠিটি ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি মোহসেন রেজাইয়ের উদ্দেশে লেখা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে চিঠির বিস্তারিত বিষয় এখনও স্পষ্ট নয়।
ধারণা করা হচ্ছে, চিঠিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কিছু প্রতিশ্রুতি চেয়েছে ওয়াশিংটন। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের মাধ্যমে কর্মসূচি পর্যবেক্ষণের সুযোগ এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বিষয় রয়েছে। তবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানো হবে না বলে আগেই জানিয়েছে তেহরান।
আলোচনায় হরমুজ প্রণালি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর নির্দেশ দেওয়ার খবর নাকচ করেছেন। তবে ভ্যান্সের পাঠানো চিঠিটি ইরানে চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশের সুযোগ নিয়ে বলে দাবি করেছেন তিনি। এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি ট্রাম্প।
ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলা আলোচনায় তেহরানের মূল প্রস্তাব এখনও অপরিবর্তিত। প্রস্তাব অনুযায়ী, জুনের সমঝোতা স্মারকে ফিরে যাওয়ার বিনিময়ে কয়েক দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে পারে ইরান।
তেহরানের দাবির মধ্যে রয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামুদ্রিক অবরোধ তুলে নেওয়া, তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং লেবাননসহ আঞ্চলিক সংঘাতগুলোতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে এখনও ইসরায়েলি বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে।
ইরানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এর কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেওয়া হয়েছে কি না, তা জানায়নি।
ইরানের রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ সংবাদপত্র ‘জমহুরি-ই ইসলামি’ শনিবার এক সম্পাদকীয়তে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা কম। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর আবার সংঘাত শুরু হতে পারে। তা সত্ত্বেও আগামী কয়েক দিনের আলোচনা ও বৈঠকে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া জরুরি।
সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘যুদ্ধকে ইরানের জন্য অনিবার্য পরিণতি হিসেবে মেনে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না।’
হরমুজে জাহাজ চলাচলে উত্তেজনা
হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জাহাজে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে প্রণালিতে সমুদ্র মাইনের ঝুঁকি রয়েছে বলেও সতর্ক করেছে তারা। অন্যদিকে আরব দেশগুলোর তেলবাহী জাহাজ চলাচলে সহায়তা ও নিরাপত্তা দিচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
শনিবার বিকেলে ইরানের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, দক্ষিণাঞ্চলের কেশম দ্বীপের কাছে দুটি মাছ ধরার নৌকায় মার্কিন ড্রোন হামলা হয়েছে। এতে কয়েকজন জেলে আহত হয়েছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের দাবি, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ‘অননুমোদিত’ পথে চলাচলের সময় মাইনে আঘাত লেগে অন্তত ছয়টি তেলবাহী ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০ লাখ ব্যারেল তেলবাহী একটি বিশাল ট্যাংকারও রয়েছে। শুক্রবার রাতে এ বিষয়ে একটি ছোট নৌকা থেকে ধারণ করা ভিডিও প্রকাশ করে তারা। ভিডিওতে বড় একটি জাহাজে আগুন নেভানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়।
এদিকে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) শুক্রবার জানায়, এর আগের দিন ওমানের খাসাবের উত্তর-পূর্বে একটি ট্যাংকারে নতুন ধরনের হামলা হয়েছে। একটি ছোট নৌকা থেকে জাহাজটির পানির ওপরের অংশে দুটি বিস্ফোরক যন্ত্র লাগানো হয়। বিস্ফোরণে ইঞ্জিনকক্ষে আগুন ধরে যায় এবং কিছু সময়ের জন্য জাহাজটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে পড়ে।
ইউকেএমটিওর তথ্য অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ১৫৫টি জাহাজ প্রবেশ এবং ১২২টি জাহাজ বের হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এই চলাচল ৭০ শতাংশ কম।
শুক্রবার এক ভিডিওবার্তায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান ব্র্যাড কুপার বলেন, তিনি হরমুজ প্রণালির ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় পণ্য, অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী বহু জাহাজ দেখেছেন। এসব জাহাজকে মার্কিন বিমান ও সমুদ্র ড্রোন নিরাপত্তা দিচ্ছে।
কুপারের দাবি, সেখানে আইআরজিসির কোনো উপস্থিতি তিনি দেখেননি। কয়েক দশক ধরে এই বাহিনী বাণিজ্যিক জাহাজকে হয়রানি, হুমকি ও জব্দ করলেও এখন তাদের নৌবাহিনী কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে।
‘পুরোনো সীমারেখা আর কার্যকর নয়’
আট মাসের যুদ্ধের পর ইরানের নেতাদের বক্তব্য আরও কঠোর হয়েছে। শনিবার সর্বোচ্চ নেতার বার্তার পর দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মোহাম্মদ আকরামিনিয়া ট্রাম্প প্রশাসনকে হামলার বিষয়ে সতর্ক করেন।
মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট যদি আবার হুমকি এবং ইসরায়েলের স্বার্থে আঞ্চলিক দুঃসাহসিকতা দেখান, তাহলে যুদ্ধের আগুন আরও বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে।
ইউরোপীয় মিত্রদেরও সমালোচনা করেছেন ইরানের কর্মকর্তারা। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস সম্প্রতি বলেছেন, গত আট মাসের যুদ্ধে ইউরোপের ব্যয় ১০০ বিলিয়ন ইউরো ছাড়িয়েছে। এর জবাবে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান রেজাই বলেন, যুদ্ধের সময় সমর্থন জানানো ইউরোপ এখন ক্ষতির মুখে পড়ে অভিযোগ করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, যুদ্ধাপরাধের পক্ষে উল্লাস করার সময় ইউরোপ কি ভেবেছিল এর প্রভাব তাদের ওপর পড়বে না? যুদ্ধ ও সন্ত্রাসের মূল্য দিতে হয়, এখন তাদের সেই মূল্য দেওয়ার সময়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও বলেন, গত বছরের যুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের হয়ে ‘নোংরা কাজ’ করছে বলে মন্তব্য করেছিলেন মের্ৎস। তার দাবি, ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী দেশের মানুষের ক্ষতি করার সাহস দেখানো পক্ষগুলোর বিরুদ্ধে যে আঘাত হানবে, তার তুলনায় ১০০ বিলিয়ন ইউরোর ক্ষতি কিছুই নয়।
আব্বাস আরাঘচি আরও লেখেন, ‘পুরোনো সীমারেখা এখন অতীত।’
এদিকে মার্কিন সিনেটর ক্রিস মারফি চলতি সপ্তাহে বলেছেন, যুদ্ধ আবার শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বল্পমেয়াদি কিন্তু তীব্র সামরিক অভিযানের সম্ভাব্য রূপরেখা নিয়ে তিনি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তার মতে, এমন পরিকল্পনা ভয়াবহ উত্তেজনা বাড়াবে এবং আইনের শাসনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকারকে ধ্বংসের মুখে ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের কর্মকর্তা এরিক ব্রুয়ারও ইরানে ব্যাপক বিমান হামলার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, ইরানের অবশিষ্ট পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সামরিক হামলা চালিয়ে কী অর্জন করা সম্ভব, তা স্পষ্ট নয়। জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালালেও তেহরান মার্কিন আলোচনার শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হবে, এমন সম্ভাবনা কম।
ব্রুয়ার সতর্ক করে বলেন, হামলা হলে ইরানও পুরো অঞ্চলে পাল্টা আঘাত হানবে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদারদের জন্য যুদ্ধ আরও যন্ত্রণাদায়ক এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠতে পারে। তার মতে, সম্ভাব্য অভিযানের ঝুঁকি এর সম্ভাব্য লাভের চেয়ে অনেক বেশি।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক