গাজা গণহত্যায় ইসরায়েলকে অস্ত্র ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিয়েছিল আমিরাত
ফিলিস্তিনের গাজায় অভিযান ও গণহত্যা চালাতে ইসরায়েলকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা ও লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চলে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিয়েছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি সরকারি নথিতে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এমিরেটস লিকস নামের একটি ওয়েবসাইট নথিটি প্রকাশ করে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের ওই নথিটি ইউএই সশস্ত্র বাহিনীর যৌথ অপারেশন কমান্ডের উদ্দেশে লেখা হয়েছিল। এতে দেখা যায়, ইয়েমেন, ইরিত্রিয়া ও সোমালিয়ায় অবস্থিত ইউএইর সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইসরায়েলকে সামরিক, লজিস্টিক ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। খবর জেরুজালেম পোস্ট।
নথির ভাষ্য স্পষ্টভাবে ইসরায়েলপন্থি। এক জায়গায় ‘ফিলিস্তিনে সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে ইসরায়েলের ওপর হামলা শুরুর’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আব্রাহাম চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়, ২০২০ সালের ঐতিহাসিক চুক্তির পর থেকে ইউএই ও ইসরায়েলের মধ্যে সাংস্কৃতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে।
নথিতে নিশ্চিত করা হয়েছে, ইউএইর যৌথ অপারেশন কমান্ড ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের আল-মোখা, ইরিত্রিয়ার মাসাওয়া ও আসাব এবং সোমালিয়ার বেরবেরা ও বাসসা ঘাঁটি ব্যবহার করে ইসরায়েলকে সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
এতে বলা হয়, ‘দ্রুত প্রস্তুতি ও বিদ্যমান সক্ষমতা মোতায়েন’ করে দক্ষিণ লোহিত সাগর অঞ্চলের ঘাঁটিগুলো (বিশেষ করে ইয়েমেনে) ইসরায়েলকে সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু দিয়ে সজ্জিত করতে হবে।
নথি অনুযায়ী, ইউএইর সামরিক কর্মকর্তারা বিভিন্ন ঘাঁটি পরিদর্শন করে সেগুলোর সক্ষমতা যাচাইও করেন।
কাতার ও কুয়েত নিয়ে তদন্ত
নথির আরেক অংশে বলা হয়েছে, হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার পরপরই ইউএই কাতারের ‘ব্যাপক সহায়তা’ নিয়ে বিস্তৃত তদন্ত চালায়। তদন্তে বলা হয়, হামাসকে কাতারের দেওয়া আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা ছিল ‘খুবই বড় মাত্রার’ এবং কুয়েতের সহায়তা ছিল ‘দক্ষিণ লোহিত সাগর এলাকায় আমাদের যেকোনো তৎপরতা ব্যাহত করার জন্য যথেষ্ট’।
এ কারণে ইউএই যৌথ অপারেশন কমান্ডের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বেড়ে যায় এবং ব্যয়ও ‘উল্লেখযোগ্যভাবে’ বৃদ্ধি পায়। নথিতে কুয়েতকে ইউএইর ‘বিরোধী পক্ষগুলোর একটি’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয়
নথিতে অক্টোবর মাসে ইউএই সামরিক কর্মকর্তাদের একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের কথা বলা হয়েছে। ১৯ অক্টোবর ইয়েমেনের আল-মোখা ঘাঁটিতে ইউএই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাঈদ আল-মারজুকি ইয়েমেনি রেজিস্ট্যান্স বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার তারেক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ সালেহর সঙ্গে বৈঠক করেন।
ওই বৈঠকে ইয়েমেনের ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস (এনআরএফ) ও ইসরায়েলের মধ্যে যোগাযোগ চ্যানেল খোলার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে ‘সব হালকা ও মাঝারি অস্ত্র’ ইসরায়েলে পাঠানোর জন্য প্রযুক্তিগত ও লজিস্টিকভাবে প্রস্তুত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
২১ অক্টোবর ইরিত্রিয়ার আসাব ঘাঁটিতে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, এই ঘাঁটিকে ‘সব ধরনের লজিস্টিক সহায়তা’ দেওয়া হবে এবং দাহলাক দ্বীপ ও দাহলাক দ্বীপপুঞ্জের সব স্থান ইসরায়েলকে সরবরাহ দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা হবে। এর মধ্যে ছিল হেলিকপ্টার, ভাসমান জেটি ও যোগাযোগ কেন্দ্র ব্যবহার করে তেল আবিবে সরঞ্জাম পাঠানোর ব্যবস্থাও।
ফাঁস হওয়া নথিতে আরও বলা হয়েছে, ওই ঘাঁটিতে থাকা ইউএইর ২৭টি আধুনিক ট্যাংক জাহাজে করে তেল আবিবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং গুদামে মজুত থাকা ফসফরাস ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলকে দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল।
এ ছাড়া ২১ অক্টোবর মাসাওয়া ঘাঁটিতে আরেক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, আগে যে অপারেশন রুম পশ্চিম উপকূলে আল-ইসলাহ বা মুসলিম ব্রাদারহুডের তৎপরতা নজরদারি করত, সেটিকে এখন ইসরায়েলের জন্য গোয়েন্দা সহায়তায় নিয়োজিত করা হবে।
ইউএই এ কাজে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থা স্ট্র্যাটফরের সহায়তাও চায়। বৈঠকে স্ট্র্যাটফরের প্রতিনিধি রায়ান পল উপস্থিত ছিলেন।
নথিতে বলা হয়েছে, ‘ফিলিস্তিনের সন্ত্রাসীরা পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত’ ইসরায়েলকে এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
এমিরেটস লিকস বলেছে, এসব নথি গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের সময় ইসরায়েলকে সহায়তায় ইউএইর ‘অভূতপূর্ব মাত্রার সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা’ প্রকাশ করেছে—যেখানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথজুড়ে বিস্তৃত ঘাঁটির নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক