গাজা যুদ্ধ বন্ধ পরিকল্পনার ‘দ্বিতীয় ধাপ’ শুরু : ট্রাম্পের দূত
গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রণীত পরিকল্পনার ‘দ্বিতীয় ধাপ’ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।
স্থানীয় সময় বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে উইটকফ জানান, ট্রাম্পের ২০ দফা গাজা পরিকল্পনা এখন ‘যুদ্ধবিরতি থেকে নিরস্ত্রীকরণ, টেকনোক্র্যাটিক শাসনব্যবস্থা এবং পুনর্গঠনের দিকে’ অগ্রসর হচ্ছে।
উইটকফ বলেন, দ্বিতীয় ধাপে একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠন করা হবে, যা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজা উপত্যকা পরিচালনা করবে। পাশাপাশি সেখানে ‘পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ ও পুনর্গঠন’ কার্যক্রম শুরু হবে।
উইটকফ আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে হামাস তাদের সব দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে পালন করবে, যার মধ্যে সর্বশেষ নিহত জিম্মির মরদেহ দ্রুত ফেরত দেওয়াও রয়েছে। এতে ব্যর্থ হলে গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হবে।’
তবে গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্যমতে, গত অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ইসরায়েল এখন পর্যন্ত এক হাজার ১৯০ বারের বেশি লঙ্ঘন করেছে। এতে ৪০০–এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং গাজায় জরুরি মানবিক সহায়তা প্রবেশেও বাধা দেওয়া হয়েছে।
হামাস এখন পর্যন্ত উইটকফের ঘোষণার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে আল জাজিরার প্রতিবেদক তারেক আবু আজ্জুম জানান, এর আগে হামাস বলেছিল তারা গাজার দৈনন্দিন প্রশাসনিক দায়িত্ব ছাড়তে প্রস্তুত। কিন্তু প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তী প্রশাসনের কাঠামো ও ক্ষমতা এখনো স্পষ্ট নয়।
আবু আজ্জুম আরও বলেন, গাজার পুনর্গঠন নিয়েও বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে, কারণ ইসরায়েলের হামলায় উপত্যকার ৮০ শতাংশের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। যুদ্ধবিরতি কতটা টেকসই হবে—সেটাই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। পরিস্থিতি আবার খারাপ হলে এই পরিকল্পনাগুলো পুরোপুরি ভেস্তে যেতে পারে।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দপ্তর জানিয়েছে, তিনি এক ইসরায়েলি সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা রান গভিলির পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন, যার মরদেহ এখনো গাজায় রয়েছে। নেতানিয়াহু বলেছেন, তার মরদেহ ফেরত আনা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
ট্রাম্পের ২০ দফা প্রস্তাবে আরও রয়েছে—ট্রাম্পের নেতৃত্বে একটি ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন এবং গাজার নিরাপত্তা তদারকিতে একটি ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী’ মোতায়েন।
গত সপ্তাহে নেতানিয়াহু জানান, জাতিসংঘের সাবেক দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ এই বোর্ডের নেতৃত্ব দেবেন, যা গাজায় ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটিক সরকারের কাজ তদারকি করবে।
মধ্যস্থতাকারীদের স্বাগত
গাজা সংকটের মধ্যস্থতাকারী কাতার, তুরস্ক ও মিসর এই টেকনোক্র্যাটিক কমিটি গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, এতে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে।
তারা সব পক্ষকে চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে, যাতে টেকসই শান্তি ও গাজার পুনর্গঠনের পরিবেশ তৈরি হয়।
তবে আল জাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা এই পরিকল্পনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, পুরো প্রক্রিয়াটিই ‘ইসরায়েলের পক্ষে সাজানো’। তাঁর মতে, ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও স্বাধীনতার বিষয়টি আবারও উপেক্ষিত হচ্ছে।
মানবিক সংকট অব্যাহত
এদিকে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন মানবিক সংস্থা আবারও ইসরায়েলের প্রতি গাজায় অবাধে ত্রাণ প্রবেশের আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা দখলকারী শক্তি হিসেবে ইসরায়েলের দায়িত্ব হলো সেখানকার জনগণের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করা। অথচ যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশের কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।
ফলে লাখো ফিলিস্তিনি পরিবার অস্থায়ী তাঁবু ও ঝুঁকিপূর্ণ আশ্রয়ে শীতের কঠোর অবস্থার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।
বুধবার খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে এক স্বাস্থ্যকর্মী ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আল জাজিরা। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ১৫টি মরদেহ হাসপাতালে আনা হয়েছে, যার মধ্যে ১৩টি ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজার ৪০০–এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক