ট্রাম্পের লোভের কারণে ঐতিহ্য হারানোর আতঙ্কে গ্রিনল্যান্ডবাসী
গ্রিনল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলের আর্কটিক শহর ইলুলিসাতে বিশাল আইসফিয়র্ডের পাশে বসবাস করা জেলে জোয়েল হ্যানসেন বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দখল নেওয়ার আশঙ্কায় তিনি ‘ভীষণ আতঙ্কিত’।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই বলেছেন, ‘একভাবে না একভাবে’ গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হবে এবং সেই লক্ষ্য অর্জনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করেননি।
ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, গ্রিনল্যান্ড ভৌগোলিকভাবে উত্তর আমেরিকার অংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল আগ্রহ দ্বীপটির বিপুল খনিজ সম্পদের দিকেই। খবর আল জাজিরার।
আধা ইনুইট ও আধা ড্যানিশ জোয়েল হ্যানসেন গত ১৪ বছর ধরে ইলুলিসাতের আশপাশের বরফে ভরা সাগরে মাছ ধরছেন। তিনি বলেন, আমি আমেরিকান হতে ভয় পাচ্ছি। আলাস্কার ইনুইটদের জীবন আমি দেখেছি—তারা কত কষ্টে আছে। তিনি যোগ করেন, আমি চাই না আমার জীবন বদলে যাক।
১৭২১ সালে ডেনমার্কের উপনিবেশ স্থাপনের পর থেকে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সম্পর্ক সব সময় মসৃণ ছিল না। তবু হ্যানসেন মনে করেন, ডেনমার্কের সঙ্গেই থাকাই হয়তো ভালো। তিনি বলেন, আমি গ্রিনল্যান্ডকে ভালোবাসি, কারণ এখানে মাছ ধরতে গেলে আমরা নিজের মতো করে কাজ করার স্বাধীনতা পাই।
বিপুল খনিজ সম্পদের দ্বীপ
গ্রিনল্যান্ড ১৯৭৯ সালে ‘হোম রুল’ এবং ২০০৯ সালের স্বশাসন আইনের মাধ্যমে আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন পেলেও, এখনো এটি ডেনমার্কের অংশ এবং রাজনৈতিকভাবে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত। তবে ভৌগোলিকভাবে এটি উত্তর আমেরিকার অঞ্চলে অবস্থিত।
দ্বীপটি অত্যন্ত দুর্গম ও প্রতিকূল হওয়ায় এখানে থাকা দস্তা, লোহা, ইউরেনিয়াম ও গ্রাফাইটের মতো খনিজ সম্পদের বড় অংশ এখনো উত্তোলন করা হয়নি। ধারণা করা হয়, এখানে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম বিরল খনিজ (রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস) মজুত রয়েছে।
এই খনিজগুলো প্রক্রিয়াজাত করার পর চৌম্বক ও বৈদ্যুতিক বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়, যা আধুনিক প্রযুক্তির জন্য অপরিহার্য—যেমন উইন্ড টারবাইন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, স্মার্টফোন, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও যুদ্ধবিমান তৈরিতে।
বিশেষ করে সামরিক ব্যবহারের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ, কেননা চীনের কাছে বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ বিরল খনিজ রয়েছে এবং তারা প্রায় ৯০ শতাংশ প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ করে।
বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডে মাত্র দুটি খনি চালু আছে। তবে স্থানীয়রা মনে করেন, তারা নিজেরাই খনিজ প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেন। হ্যানসেন বলেন, গ্রিনল্যান্ডে আমাদের অনেক খনিজ আছে, চাইলে আমরা নিজেই একটি দেশ হতে পারি। ট্রাম্পের টাকা আমাদের দরকার নেই।
‘আমরা একেবারেই আলাদা’
খনিজ উত্তোলনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডে আগ্রাসী আগ্রহ ইলুলিসাত অঞ্চলের ইনুইট সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। টানা দুই মাসের মেরু রাত শেষে এই সপ্তাহে সেখানে আবার সূর্য উঠেছে।
ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বৈঠকের আগে, ইলুলিসাত আইসফিয়র্ড ভিজিটর সেন্টারের প্রধান কার্ল স্যান্ডগ্রিন আল জাজিরাকে বলেন, আমার আশা, ওই আলোচনায় রুবিও কিছু মানবিকতা দেখাবেন।
কার্ল স্যান্ডগ্রিন বলেন, তার ভয় মূলত ইনুইটদের জীবনযাপন নিয়ে। তিনি বলেন, আমরা একেবারেই আলাদা। আমরা ইনুইট, হাজার হাজার বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। এটা আমার ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ—কেবল সম্পদের কথা ভাবা লোকদের ভবিষ্যৎ নয়।
গ্রিনল্যান্ডবাসীরা আশঙ্কা করছেন, খনিজ সম্পদের লোভে যদি যুক্তরাষ্ট্র তাদের ভূমিতে হস্তক্ষেপ বাড়ায়, তবে তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা ও স্বাধীনতাই সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়বে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক