ইয়েমেনে চরম খাদ্য সংকট, সাহায্য সংস্থাগুলোর হুঁশিয়ারি
বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ ইয়েমেন খাদ্য ঘাটতির এক বিপজ্জনক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের শুরুর দিকে দেশটির অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখোমুখি হতে পারে।
ক্ষুধা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা 'ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন' (আইপিসি)-এর নতুন প্রক্ষেপণ অনুযায়ী সোমবার (১৯ জানুয়ারি) এই সতর্কতা জারি করা হয়। এতে দেখা গেছে, অতিরিক্ত আরও ১০ লাখ মানুষ প্রাণঘাতী ক্ষুধার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে নতুন করে ‘অভ্যন্তরীণ সংঘাত’ শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই ভয়াবহ তথ্য সামনে এলো। খবর আলজাজিরার।
দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা ও বর্তমান পরিস্থিতি
আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, আগামী দুই মাসের মধ্যে ইয়েমেনের চারটি জেলার প্রায় ৪০ হাজার মানুষ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়বে। ২০২২ সালের পর এটিই দেশটির জন্য সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন পূর্বাভাস।
ইয়েমেনে বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধ এবং গণহারে বাস্তুচ্যুতি মানুষের জীবিকা ধ্বংস করে ফেলেছে, পাশাপাশি মৌলিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবাকেও সীমিত করে ফেলেছে। দেশজুড়ে অর্থনৈতিক ধসের ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে এবং খাদ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। একই সময়ে মানবিক সহায়তা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। আইআরসি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা তহবিলের ২৫ শতাংশেরও কম সংগৃহীত হয়েছে—যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। অন্যদিকে, জীবন রক্ষাকারী পুষ্টি কর্মসূচির ক্ষেত্রে এই হার ১০ শতাংশেরও নিচে।
আইআরসি এক বিবৃতিতে বলেছে, মানবিক তহবিলে বিপর্যয়কর ঘাটতি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আঘাত, অর্থনৈতিক ধস এবং সাম্প্রতিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটছে। এই বিপর্যয় রুখতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
সাধারণ মানুষের চরম দুর্দশা
ইয়েমেনে আইআরসি’র আবাসিক পরিচালক ক্যারোলিন সেকিওয়া এই পরিস্থিতির দ্রুত অবনতিকে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘ইয়েমেনের মানুষ এখনো সেই সময়ের কথা ভোলেনি যখন তারা জানত না পরের বেলার খাবার কোত্থেকে আসবে। আমার ভয় হচ্ছে, আমরা আবার সেই অন্ধকার অধ্যায়ে ফিরে যাচ্ছি। বর্তমান পরিস্থিতির বিশেষত্ব হলো এর পতনের দ্রুত গতি।’
ক্যারোলিন সেকিওয়া আরও জানান, পরিবারগুলো এখন বেপরোয়া সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের খাবারের জন্য বনজ লতাপাতা সংগ্রহ করছেন। তবে সেকিওয়া জোর দিয়ে বলেন যে, এই সংকট এখনো প্রতিরোধযোগ্য। দাতা দেশগুলোকে দ্রুত এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পরিবারগুলোকে মর্যাদার সাথে মৌলিক চাহিদা মেটাতে সহায়তার জন্য 'নগদ অর্থ সহায়তা' অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হতে পারে।
রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা উত্তেজনা
মানবিক এই সতর্কতা এমন এক সময়ে এলো যখন ইয়েমেনে নতুন করে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশ সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে ইয়েমেন নিয়ে টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়েছে।
গত ডিসেম্বরে, সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী 'সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল' ইয়েমেনের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয় এবং সৌদি সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে সৌদি সমর্থিত বাহিনী সেই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, ভূ-রাজনীতি এবং তেল নীতি নিয়ে অমীমাংসিত এই বিরোধ ইয়েমেনকে আবারও বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলতে পারে। আর এটি বর্তমানের এই চরম খাদ্য সংকটকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক