ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা, সর্বশেষ পরিস্থিতি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আজ শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে একযোগে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে পাল্টা জবাব দিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েল সরকারের ঘোষিত এই সামরিক পদক্ষেপের পর থেকে উদ্ভূত সর্বশেষ পরিস্থিতি নিচে তুলে ধরা হলো:
ইরানজুড়ে হামলা
তেহরানের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখার মধ্য দিয়ে এই যৌথ অভিযান শুরু হয়। ইসরায়েল একে একটি ‘প্রতিরোধমূলক’ হামলা হিসেবে অভিহিত করেছে। হামলার পরপরই ট্রাম্প তাঁর ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে একটি আকস্মিক ভিডিও বার্তায় জানান, ‘আসন্ন হুমকি নির্মূল করার লক্ষ্যে’ ইরানে মার্কিন যুদ্ধাভিযান শুরু হয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, তারা তেহরানে ইরানি শীর্ষ কর্মকর্তাদের সমবেত হওয়ার স্থান এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তারা আরও জানায়, এই হামলার পেছনে মিত্রদের কয়েক মাসের যৌথ পরিকল্পনা ছিল। ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম ‘কান’ জানায়, এই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিলেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তবে এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দাবি করেন, খামেনিসহ সকল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জীবিত আছেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার খবর পাওয়া গেছে দক্ষিণ ইরানে মেয়েদের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। বিচার বিভাগের ওয়েবসাইট ‘মিজান অনলাইন’ জানিয়েছে, সেখানে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৮৫ জন নিহত হয়েছে। তবে এএফপি স্বতন্ত্রভাবে এই সংখ্যার সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। এদিকে, ইরান পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে।
ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঝাঁক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ইসরায়েলে প্রথম দফার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। পাশাপাশি তারা বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহর এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথা জানায়। ইসরায়েলি জরুরি পরিষেবা ‘মাগেন ডেভিড অ্যাডম’ জানিয়েছে, তারা দেশের উত্তরাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে আহত এক ব্যক্তিকে চিকিৎসা দিয়েছে। এছাড়া, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বিভিন্ন স্থানে উদ্ধারকারী দল মোতায়েন করেছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে একে একে বিস্ফোরণ
পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, রাজধানী আবুধাবিতে প্রথম দফার হামলায় একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পর তারা দ্বিতীয় দফার ইরানি হামলা প্রতিহত করেছে। দুবাইয়ের বাসিন্দারা শক্তিশালী বিস্ফোরণ এবং আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের ঝিলিক দেখার কথা জানিয়েছেন। দেশটির কৃত্রিম দ্বীপ ‘দ্য পাম’ থেকেও ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে।
সৌদি আরবের রিয়াদ, বাহরাইনের মানামা এবং কাতারের দোহা থেকেও বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। কাতার ও কুয়েত তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে আসা বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। জর্ডান দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে এবং নিজের স্বার্থ রক্ষায় সর্বশক্তি প্রয়োগের অঙ্গীকার করেছে। এছাড়া ইরাকের এরবিলে মার্কিন কনস্যুলেটের কাছেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা
ফ্রান্স: প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই উত্তেজনা নিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছেন।
রাশিয়া: এই হামলাকে একটি ‘বিপজ্জনক দুঃসাহস’ বলে অভিহিত করে তারা এই অঞ্চলে ‘মহাবিপর্যয়ের’ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
ইউক্রেন: তাদের মতে, নিজস্ব জনগণ ও অন্য দেশের ওপর ইরানের ‘সহিংসতা’ এই হামলার সূত্রপাত করেছে।
যুক্তরাজ্য: তারা ভয় পাচ্ছে যে এই হামলা একটি ‘ব্যাপক আঞ্চলিক যুদ্ধে’ রূপ নিতে পারে।
অস্ট্রেলিয়া: ক্যানবেরা ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছে।
পাকিস্তান: ইরানের ওপর এই ‘অযৌক্তিক হামলার’ নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে।
হামাস ও হিজবুল্লাহ: ইরানের এই দুই মিত্র গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অঞ্চলের মানুষকে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।
আকাশপথ বন্ধ ও ফ্লাইট বাতিল
হামলার পরপরই ইরান, কাতার এবং ইরাক তাদের আকাশপথ বন্ধ করে দিয়েছে। সিরিয়াও তাদের দক্ষিণ সীমান্ত সংলগ্ন আকাশপথ ১২ ঘণ্টার জন্য বন্ধ রেখেছে। কাতার এয়ারওয়েজ দোহা থেকে তাদের সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে। রাশিয়া, এয়ার ইন্ডিয়া, লুফথানসা, টার্কিশ এয়ারলাইনস এবং ব্রিটিশ এয়ারওয়েজসহ বিশ্বের বড় বড় বিমান সংস্থাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন গন্তব্যে তাদের শত শত ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করেছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক