ট্রাম্পের ঘন ঘন বার্তা পরিবর্তন, ইরান যুদ্ধ শেষ নাকি বিস্তৃত হচ্ছে?
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে পদার্পণ করেছে। এই সংঘাত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সপ্তাহব্যাপী বিমান হামলা চালিয়ে ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের হত্যা করলেও দেশটির সরকার সবকিছু সামাল দিতে সক্ষম হচ্ছে। একই সঙ্গে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর প্রতিশোধমূলক হামলাও চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। খবর আল জাজিরার।
তেহরান হরমুজ প্রণালির ওপর কার্যত অবরোধ আরোপ করতে সক্ষম হয়েছে। এই সরু জলপথটি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ পরিবহণ করা হয়। হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ আরোপে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, এই যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী মন্দা ডেকে আনার ঝুঁকি তৈরি করেছে। আর তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এতে জ্বালানি সংকট নিরসনের চেষ্টায় ট্রাম্প প্রশাসন নিষেধাজ্ঞাভুক্ত রাশিয়ার তেল বিক্রির অনুমতি দিয়েছে এবং প্রণালিটি উন্মুক্ত করতে মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, যদিও এখনও পর্যন্ত তাতে কোনো কাজ হয়নি।
যুদ্ধের এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। গত শনিবার (২১ মার্চ) ট্রাম্প পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তুলেছেন এবং হুমকি দিয়েছেন, তেহরান ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে না দিলে তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেবেন।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, ট্রাম্প কোনো সুস্পষ্ট লক্ষ্য ছাড়াই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন এবং তেহরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে তা-ও বুঝতে ভুল করেছিলেন। এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
তাহলে ট্রাম্প কি যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন, নাকি এটিকে আরও তীব্র করতে চাইছেন?
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের পরস্পর বিরোধী বার্তা
ট্রাম্পের একটি বিবৃতিতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ‘শেষ করে আনার’ কথা বিবেচনা করছে, কিন্তু অন্য একটি বিবৃতিতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আগামী দিনগুলোতে এই সংঘাত আরও বাড়বে।
শনিবার ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এক পোস্টে বলেন, ইরানের সন্ত্রাসী শাসনের বিরুদ্ধে এবং মধ্যপ্রাচ্যে আমরা আমাদের উদ্দেশ্য পূরণের খুব কাছাকাছি। আমাদের বিশাল সামরিক অভিযান গুটিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প যুদ্ধের লক্ষ্য হিসেবে বলেছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে অকার্যকর করে দেওয়া, দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের ভিত্তি ধ্বংস করা, ইরানের নৌ ও বিমান বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করা এবং ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের কাছাকাছিও যেতে না দেওয়া, মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সুরক্ষা প্রদান এবং হরমুজ প্রণালীর প্রহরা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু উভয়েই গত কয়েকদিনে বারবার দাবি করেছেন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ‘সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস’ হয়ে গেছে। তবে তেহরান ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলা এবং এই অঞ্চলের দেশগুলোতে আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা বাঙ্কার বাস্টার বোমাবর্ষণসহ ইরানের উপকূলে ব্যাপক হামলা চালিয়েছেন, কিন্তু তারপরেও হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা সীমিত করতে পারেননি।
শনিবার ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে মানচিত্র থেকে মুছে দিয়েছে এবং তিনি নির্ধারিত সময়ের কয়েক সপ্তাহ আগেই নিজের লক্ষ্য পূরণ করেছেন! তিনি আরও বলেন, ইরানের নেতৃত্ব শেষ হয়ে গেছে। তাদের নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী মৃত, তাদের কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই এবং তারা একটি চুক্তি করতে চায়।
তবে ইরানের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছেন।
মাত্র এক ঘণ্টা পরেই ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এসে ইরানকে সতর্ক বার্তা দেন। ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ইরান যদি ঠিক এই মুহূর্ত থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোনো হুমকি ছাড়াই হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণরূপে খুলে না দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত করে সেগুলোকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে এবং প্রথমে সবচেয়ে বড়টি দিয়েই শুরু হবে!
এর জবাবে ইরান বলেছে, তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হলে তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা চালাবে। তারা ইতোমধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন সম্পদ ও জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।
ট্রাম্পের অভিযান ‘গুটিয়ে আনার’ এবং পরে তা আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণার মধ্যেই তার প্রশাসন প্রায় ২ হাজার ৫০০ অতিরিক্ত মেরিন সেনাসহ আরও তিনটি যুদ্ধজাহাজ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রায় ৫০ হাজার সেনাসদস্য ইতোমধ্যেই মোতায়েন করা হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কবে শেষ হবে?
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ট্রাম্পসহ মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে উত্থাপিত প্রধান প্রশ্নগুলোর মধ্যে একটি হলো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কবে শেষ হবে?
পরদিন ট্রাম্প ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইলকে বলেন, যুদ্ধ শেষ হতে প্রায় চার সপ্তাহ সময় লাগবে। এটি বরাবরই প্রায় চার সপ্তাহের একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু এর একদিন পরই ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে বলেন, আমরা চার থেকে পাঁচ সপ্তাহের একটি অনুমান করেছিলাম, তবে এর চেয়েও অনেক বেশি সময় যুদ্ধ চালিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা আমাদের রয়েছে।
গত ৮ মার্চ প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ সিবিএস টিভির এক অনুষ্ঠানে বলেন, এটা তো কেবল শুরু। পরদিন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট সেই একই চ্যানেলকে বলেন, তিনি মনে করেন, যুদ্ধটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। মার্কিন সামরিক অভিযানটি নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই সম্পন্ন হয়েছে।
এরপর ৯ মার্চ ট্রাম্প বলেন, বলা যেতে পারে যুদ্ধটি ‘একই সঙ্গে সম্পন্ন এবং সবে শুরু হয়েছে’। একই দিন পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, আমরা ইতোমধ্যে অনেক দিক থেকে জিতেছি, কিন্তু যথেষ্ট পর্যায়ে জয়ী হইনি। ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও কঠিন ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
গত ১১ মার্চ ট্রাম্প বলেন, আমরা তো আগেভাগে সরে যেতে চাই না, তাই না? আমাদের কাজটা শেষ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কেন ইরানের ওপর হামলা চালায়?
গত ২ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, তেহরানের আধিপত্যবাদ ও ইসলামপন্থি শাসনের বিরুদ্ধে ‘৪৭ বছরের দীর্ঘ’ যুদ্ধের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যেই এই আক্রমণ চালানো হয়েছে। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় অস্বীকৃতি জানানোয় এ অভিযান শুরু করা হয়েছে।
কয়েক ঘণ্টা পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, ইসরায়েল যে ইরানের ওপর হামলা চালাতে চলেছে, তা যুক্তরাষ্ট্র জানত। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে, ইরানের সম্ভাব্য প্রতিশোধমূলক হামলায় মার্কিন বাহিনী লক্ষ্যবস্তু হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিরোধমূলক হামলা চালানো প্রয়োজন।
‘তারা যাতে আরও বেশি ক্ষতি করতে না পারে, সেজন্য আমরা আগেভাগেই প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়েছি’, যোগ করেন রুবিও।
এর ফলে ওয়াশিংটনে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সমালোচকরা বলেন, ইসরায়েলই যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য করেছে।
অল্প সময়ের মধ্যেই ট্রাম্প অবশ্য তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদ করে বলেন, ইরান হামলা করতে যাচ্ছিল। আমরা যদি এটা না করতাম, তাহলে তারাই আগে হামলা করত। তাই বরং আমিই হয়ত ইসরায়েলকে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করেছি।
গত বছরের শেষের দিকে শুরু হওয়া আলোচনার আরেকটি পর্বের জন্য ওয়াশিংটন ও তেহরানের বৈঠকে বসার কথা ছিল। এর মধেই এ যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের আগে ওমানের এক মধ্যস্থতাকারী বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি চুক্তি ‘নাগালের মধ্যেই’ রয়েছে।
তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরির দ্বারপ্রান্তে ছিল বলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের করা দাবি জাতিসংঘের পারমাণবিক নজরদারি সংস্থার সমর্থন পায়নি। গত সপ্তাহে মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ডও কংগ্রেসকে বলেছেন, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির মতো অবস্থানে নেই।
কয়েকজন বিশ্লেষক বলেছেন, নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধে যেতে রাজি হয়েছে, যিনি কয়েক দশক ধরে ইরানে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ চেয়ে আসছেন।
এই পরস্পরবিরোধী বার্তায় আসলে মার্কিন কৌশল কী?
বিশ্লেষকরা বলেছেন, ইরান যুদ্ধে বারবার লক্ষ্যবস্তু বদলানো বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি, কিছুটা হলেও এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোলা রাখার কৌশলকেও ফুটিয়ে তুলে।
আরব পার্সপেক্টিভস ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক জেইদোন আলকিনানি আল জাজিরাকে বলেন, সংঘাতের শুরুর দিনগুলোতে সুস্পষ্ট লক্ষ্যবস্তু এবং সীমিত উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে হয়েছিল। এখন এটি আরও বিশৃঙ্খল। তবে তেল বা জ্বালানি স্থাপনায় হামলা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
গ্লোবাল পলিসি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট পাওলো ভন শিরাখ আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প ‘খুব দ্রুত’ তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তার পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে তা অনুমান করা কঠিন। যুদ্ধ শেষ করার জন্য ট্রাম্পের হাতে কী কী ‘উপায়’ আছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
ভন শিরাখ আরও বলেন, ইরানের আকার ও জনসংখ্যার কারণে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করতে পারবে কি না, তা ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন।
দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরাকে দেড় লাখ মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হয়, সেই ঘটনার উদাহরণ টেনে এই বিশ্লেষক বলেন, ট্রাম্প যদি ইরানকে দখল করতে চান, তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় পাঁচ লাখ সৈন্যের প্রয়োজন হতে পারে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক