ইরানের পর কোন ‘শত্রু’ ট্রাম্পের সামনে?
ইরান যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহে পা দিতে যাওয়ার পথে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রণকৌশল এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে। গত শুক্রবার তিনি যুদ্ধ ‘গুটিয়ে নেওয়ার’ ইঙ্গিত দিলেও, মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে সুর বদলে ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ‘নিশ্চিহ্ন’ করার হুমকি দিয়েছেন। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, আগামী পাঁচদিনের জন্য তিনি ইরানের বিদ্যুৎ স্থাপনায় হামলা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান এবং খামখেয়ালি বার্তা এখন বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। প্রশ্ন উঠেছে—আগ্রাসী ট্রাম্পের পরবর্তী টার্গেট আসলে কে বা কী?
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আলটিমেটাম অনুযায়ী, তাঁর পরবর্তী সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামো। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলা চালালে ইরানে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দেবে। হাসপাতাল, পানি সরবরাহ এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। ট্রাম্প সম্ভবত মনে করছেন, বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করলে ইরানের বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনীর ওপর চাপ সৃষ্টি হবে এবং তারা পিছু হটতে বাধ্য হবে।
অনেক সামরিক বিশ্লেষক মনে করছেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের হুমকির আড়ালে ট্রাম্পের আসল টার্গেট হতে পারে ইরানের তেল রপ্তানির মূল কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ। এছাড়া হরমুজ প্রণালি বরাবর লুকিয়ে রাখা ইরানের ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র সাইটগুলো ধ্বংস করাও তার অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। তবে এই ধরনের অপারেশন চালাতে গেলে স্থল সৈন্য পাঠানোর প্রয়োজন হতে পারে, যা ট্রাম্পের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক জুয়া।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের লড়াই কেবল ইরানের বিরুদ্ধে নয়, বরং তাঁর নিজের 'রেড লাইন' বা শেষ সীমা রক্ষার লড়াইও বটে।
ন্যাটো মিত্ররা এই যুদ্ধে সরাসরি যোগ দিতে অস্বীকার করায় ট্রাম্প তাদের ‘ভীরু’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো যাতে তারা হরমুজ প্রণালি সুরক্ষায় মার্কিন নেতৃত্বে শামিল হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় এবং জনগণের বড় অংশ (প্রায় ৬০ শতাংশ) এই যুদ্ধের বিপক্ষে থাকায় ট্রাম্পের জন্য তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের মতে, ট্রাম্পের পরবর্তী চাল হতে পারে ‘পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়ানো’। অর্থাৎ, ইরানকে এমন এক ভয়াবহ ধাক্কা দেওয়া যাতে তারা আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য হয়। কিন্তু ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধান ড্যানি সিট্রিনোভিজ সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন কোনো ভালো অপশন নেই, আছে কেবল খারাপ আর খুব খারাপের মধ্য থেকে বেছে নেওয়ার সুযোগ।
ইরান ইতোমধ্যে পাল্টা হুমকি দিয়েছে যে, হামলা হলে তারা হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেবে এবং ইসরায়েলসহ মার্কিন ঘাঁটি আছে এমন দেশগুলোতে আঘাত হানবে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যে ব্যারেল প্রতি ১১৪ ডলারে পৌঁছেছে। ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ যদি কেবলই সামরিক শক্তির আস্ফালন হয়, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন যেখানে তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত হয় যুদ্ধকে এক চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে, নয়তো এক অন্তহীন ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা করবে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখন এসবের কোনোটিকেই তার প্রধান বাধা বলে মনে করছেন না। তার সামনে এখন ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’, অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট ট্রম্প এখন নিজের দেশেই তার প্রধান ‘শত্রু’ খুঁজে পেয়েছেন। আর তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী ডেমোক্র্যাট দল।
আজ সোমবার (২৩ মার্চ) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, ‘এখন ইরানের পতনের পর, আমেরিকার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো কট্টর বামপন্থী এবং চরম অযোগ্য ডেমোক্র্যাট দল। এই বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।’
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে শত্রুতার সম্পর্কটি কেবল রাজনৈতিক মতপার্থক্য নয়, বরং এটি আদর্শিক, ব্যক্তিগত এবং কৌশলগত সংঘাতের এক জটিল মিশ্রণ। ডেমোক্র্যাটদের প্রতি ট্রাম্পের এই চরম বৈরী মনোভাবের প্রধান কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়-
ট্রাম্পের 'আমেরিকা ফার্স্ট' নীতির সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের উদারপন্থি ও বিশ্বায়নপনন্থি দর্শনের চরম বিরোধ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন, ডেমোক্র্যাটদের অভিবাসন নীতি, জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত চুক্তি এবং মুক্ত বাণিজ্য নীতি আমেরিকার অর্থনীতি ও সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তিনি প্রায়ই ডেমোক্র্যাটদের ‘কট্টর বামপন্থি’ বা ‘সমাজতন্ত্রী’ বলে আক্রমণ করেন, যা তাঁর রক্ষণশীল ভোটারদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনে ডেমোক্র্যাটরা তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় আইনি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ট্রাম্পের মেয়াদকালে ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি সভা তাঁকে দুইবার অভিশংসিত করেছিল। ট্রাম্প একে ‘উইচ হান্ট’ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে দেখেন।
ট্রাম্প বিশ্বাস করেন যে, ওয়াশিংটনের আমলাতন্ত্রের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের যোগসাজশ রয়েছে, যারা পর্দার আড়াল থেকে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করছে। তিনি মনে করেন, এফবিআই বা সিআইএ’র মতো সংস্থাগুলো ডেমোক্র্যাটদের স্বার্থে তাঁর বিরুদ্ধে কাজ করে।
২০২০ সালের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান এবং পরবর্তীতে ২০২৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান—উভয় পক্ষই একে অপরের অস্তিত্বকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি মনে করে। ট্রাম্প মনে করেন, ডেমোক্র্যাটরা কারচুপির মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে চায়, আর ডেমোক্র্যাটরা মনে করেন ট্রাম্পের শাসন পদ্ধতি স্বৈরতান্ত্রিক।
ইরান যুদ্ধের ব্যয় এবং কৌশল নিয়েও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ট্রাম্পের তীব্র বিরোধ চলছে। ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফরিস বা ক্রিস মারফির মতো নেতারা ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই বলে সমালোচনা করছেন। এই সমালোচনাকে ট্রাম্প তাঁর সামরিক সাফল্যের পথে বাধা এবং দেশপ্রেমের অভাব হিসেবে দেখেন।
ট্রাম্প জানেন, ডেমোক্র্যাটদের চরম শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করলে তাঁর নিজের সমর্থক গোষ্ঠী আরও ঐক্যবদ্ধ হয়। এটি তাঁর জন্য একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র। ডেমোক্র্যাটদের ‘দেশের শত্রু’ বা ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী’ হিসেবে চিত্রিত করা তাঁর প্রচারণার একটি প্রধান কৌশল।
ট্রাম্পের চোখে ডেমোক্র্যাটরা কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, বরং তারা এমন এক শক্তি যারা তাঁর ব্যক্তিগত ইমেজ, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং তাঁর স্বপ্নের ‘আমেরিকা’ গড়ে তোলার পথে প্রধান অন্তরায়।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক