বিক্ষোভে দমন-পীড়নের জেরে ইরানের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকির মধ্যেই সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগে ইরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। খবর আলজাজিরার।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) ঘোষিত এই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানি এবং আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে। ওয়াশিংটনের মতে, এই কর্মকর্তারাই তেহরানের ‘নৃশংস’ দমন-পীড়নের ‘মূল কারিগর’।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এক বিবৃতিতে বলেন, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের দাবিতে ইরানি জনগণের পাশে শক্তভাবে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি আরও যোগ করেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশনায় ট্রেজারি বিভাগ ইরানি জনগণের ওপর নৃশংস দমন-পীড়নে জড়িত মূল নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। যারা এই শাসনের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে, তাদের লক্ষ্যবস্তু করতে ট্রেজারি বিভাগ প্রতিটি উপায় ব্যবহার করবে।’
এই নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত হবে এবং মার্কিন নাগরিকদের জন্য তাদের সঙ্গে ব্যবসা করা অবৈধ হয়ে পড়বে। ইরান ইতোমধ্যেই ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকায় এই পদক্ষেপগুলো অনেকটা প্রতীকী, তবে বিক্ষোভের মধ্যে এটি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপের ইঙ্গিত দেয়। লারিজানি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিত।
এই সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প ইরানিদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ‘দখল’ করার এবং ‘হত্যাকারী ও নির্যাতনকারীদের নাম সংরক্ষণ’ করার আহ্বান জানানোর পর লারিজানি দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ইরানিদের হত্যার জন্য অভিযুক্ত করেন। লারিজানি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে লিখেন, ‘আমরা ইরানের জনগণের মূল হত্যাকারীদের নাম ঘোষণা করছি : ১. ট্রাম্প ২. নেতানিয়াহু।’
বেশ কয়েকটি অধিকারকর্মী সংগঠনের মতে, বছরের শুরু থেকে ইরানে চলা এই বিক্ষোভের ঢেউয়ে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ইরান সরকার বিক্ষোভকারীদের ‘সশস্ত্র দাঙ্গাবাজ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যারা কি না যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উসকানিতে বিশৃঙ্খলা ছড়াচ্ছে। তাদের দাবি, বিক্ষোভে সশস্ত্র হামলায় ১০০-এর বেশি নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হয়েছে। তবে আল জাজিরা স্বাধীনভাবে এই সংখ্যাগুলো যাচাই করতে পারেনি।
ইরানি কর্তৃপক্ষ দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে নিহতের সংখ্যা বা উভয় পক্ষের দাবির সত্যতা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। গত মঙ্গলবার নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ইসরায়েলের চ্যানেল ১৪ সংবাদ প্রকাশ করে যে, ইরানের সরকারি কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তু করতে ‘বিদেশি শক্তি’ বিক্ষোভকারীদের অস্ত্র সরবরাহ করছে।
কয়েক দিন ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্টর ট্রাম্পের কড়া বক্তব্যের পর বুধবার রাতে ইরানের ওপর মার্কিন হামলা আসন্ন বলে মনে হচ্ছিল। প্রতিক্রিয়ায় ইরান তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয় এবং যেকোনো মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে কঠোর জবাব দেওয়ার হুমকি দেয়।
পুরো বিশ্ব যখন চরম উত্তেজনার মধ্য দিয়ে হামলার অপেক্ষা করছিল, ঠিক তখনই ট্রাম্প তার অবস্থান কিছুটা নরম করেন। তিনি জানান, তাকে বলা হয়েছে যে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করা বন্ধ হয়েছে। ট্রাম্প বলেন, ‘তারা (ইরানি কর্মকর্তারা) বলেছে যে মানুষ তাদের দিকে বন্দুক নিয়ে গুলি করছিল এবং তারা পাল্টা গুলি চালিয়েছে। আপনারা জানেন এটি এমনই একটি বিষয়, তবে তারা আমাকে বলেছে যে সেখানে আর কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে না, আমি আশা করি সেটি সত্য হবে।’
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প পুনরায় এই বার্তা দিয়ে বলেন যে, ইরান বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেবে না—এটি একটি ‘সুসংবাদ’।
উল্লেখ্য, গত জুন মাসে ইসরায়েল কোনো উস্কানি ছাড়াই ইরানে হামলা চালায়, যাতে ডজনখানেক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও পরমাণু বিজ্ঞানীসহ শত শত বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। ট্রাম্প বলেছিলেন যে এই ইসরায়েলি আক্রমণের পেছনে তার ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ ছিল। এছাড়া, চূড়ান্ত পর্যায়ে যুদ্ধবিরতির আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালিয়েছিল।
ইরানে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার আগে ফ্লোরিডায় নেতানিয়াহুকে আতিথ্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন যে, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক বা মিসাইল কর্মসূচি পুনরায় শুরু করে তবে তিনি আবার দেশটিতে বোমা হামলা চালাবেন। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ইরানের তেল বিক্রির পথ বন্ধ করার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করছে। বৃহস্পতিবার মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানের জ্বালানি রপ্তানির সঙ্গে জড়িত ১৮টি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নতুন ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক